দেশে দ্রুত বিস্তার লাভ করছে অনলাইন জুয়ার আসক্তি। প্রযুক্তিনির্ভর এই অবৈধ কার্যক্রম এখন অনেকের কাছে নীরব মহামারির রূপ নিয়েছে। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে বিশেষ করে তরুণ ও যুবসমাজকে টার্গেট করা১০ হচ্ছে। দ্রুত অর্থবান হওয়ার প্রলোভনে পড়ে বহু মানুষ আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত জীবনে নয়, পরিবার ও সমাজেও পড়ছে গভীরভাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক অশান্তি, বিচ্ছেদ, চুরি-ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ বাড়ছে। এমনকি আত্মহত্যার ঘটনাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে দেখা গেছে, বিদেশভিত্তিক বিভিন্ন চক্র বাংলাদেশের বাজারকে লক্ষ্য করে এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশেষ করে চীন ও নাইজেরিয়ার নাগরিকদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দেশীয় এজেন্ট এবং মোবাইল আর্থিক সেবার কিছু অসাধু কর্মী। এসব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার-দক্ষিণ) সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ক্রমেই বাড়ছে। এ ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় নিয়মিত সাইবার নজরদারি চালানো হচ্ছে। জুয়াসহ বিভিন্ন অনলাইন প্রতারণা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে অর্থ পাচারের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তবে মানি লন্ডারিং তদন্তের এখতিয়ার সিআইডির আওতায় থাকায় ডিবির পক্ষে সে অংশে তদন্ত করা সম্ভব হয় না। তার মতে, যেভাবে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটছে, তাতে শুধু একটি সংস্থার পক্ষে সব তদন্ত পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, দেশে অনলাইন জুয়া নিষিদ্ধ হলেও অসংখ্য ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ এখনো সক্রিয় রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে নতুন ব্যবহারকারী সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন জনপ্রিয় বেটিং সাইটে খেলাধুলাভিত্তিক বাজি, ক্যাসিনো গেম, স্লট গেম এবং টেবিল গেম পরিচালিত হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এসব কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণকারী একটি অংশ ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করলেও আরেকটি অংশ দুবাই, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালনা করছে পুরো নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশে অবস্থানকারী বিদেশিদের বড় একটি অংশ চীন ও নাইজেরিয়ার নাগরিক।
বিদেশি নিয়ন্ত্রকদের সহযোগিতা করছে দেশীয় এজেন্টদের একটি নেটওয়ার্ক। কমিশনের ভিত্তিতে কাজ করা এসব এজেন্ট অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ লেনদেন এবং নতুন গ্রাহক যুক্ত করার দায়িত্ব পালন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তারা মোট লেনদেনের ১৪ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পেয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত, তাদের মধ্যে অনলাইন জুয়ার প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়। জুয়ার সফটওয়্যারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে খেলোয়াড় মাঝে মাঝে জয়ের স্বাদ পায়। এতে তার মধ্যে আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লাভবান হয় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান, ক্ষতিগ্রস্ত হয় খেলোয়াড়।
গত ১৩ মে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশে অবস্থানরত ছয় চীনা নাগরিকসহ নয়জনকে গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার ইউনিট। জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, মোবাইল আর্থিক সেবাদানকারী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কিছু অসাধু কর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, সিআইডির সাইবার ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিট নিয়মিত অনলাইন জুয়া শনাক্ত ও প্রতিরোধে কাজ করছে। গত ৬ মে চারটি জুয়ার সাইট পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিদিন দুই কোটির বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে একটি চক্রের আট সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সংস্থাটি।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ১৬ জুন পর্যন্ত সাইবার নজরদারির মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ২৬৮টি ওয়েবসাইট শনাক্ত করা হয়েছে। এসব সাইট বন্ধের জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কাছে তথ্য পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি জুয়ার লেনদেনে ব্যবহৃত ৮৭৯টি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ৪৩টি হিসাবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান ডিআইজি আলি আকবর খান বলেন, সম্প্রতি অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনেক ওয়েবসাইট ইতোমধ্যে বন্ধ করা হয়েছে এবং আরও কিছু বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে। তবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও বিদেশভিত্তিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কারণে মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। তারপরও এই অপরাধকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে আনতে কাজ চলছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে অনেক তরুণ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি থেকে শুরু করে খুনের ঘটনাও ঘটছে। গত মে মাসে কুমিল্লার বরুড়ায় অনলাইন জুয়া নিয়ে বিরোধের জেরে এক কিশোর নিহত হয়। একই মাসে রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে জুয়ায় আসক্ত এক যুবকের বিরুদ্ধে স্ত্রীকে নির্যাতন করে হত্যার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনা অনলাইন জুয়ার সামাজিক ক্ষতির ভয়াবহ দিকটি সামনে নিয়ে এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমানের মতে, অনলাইন জুয়ার আসক্তি অনেক ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। তিনি বলেন, এটি মানুষের মস্তিষ্কের আনন্দকেন্দ্রকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্ষতির পরও খেলোয়াড়ের মধ্যে অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রবল আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। কিন্তু বাস্তবে সেই চক্র থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত লাভবান হয় জুয়ার প্ল্যাটফর্মগুলোই।

