বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মামলার খসড়া অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রস্তুত করে আইনি মতামতের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে পাঠিয়েছে।
তদন্ত নথি অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় এই আর্থিক কেলেঙ্কারিতে সাতটি দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত। এর মধ্যে ফিলিপাইনের ৩৬ জন, বাংলাদেশের ১০ জন, নর্থ কোরিয়ার ২ জন, চীনের ৩ জন, শ্রীলঙ্কার ৮ জন, জাপানের ১ জন এবং ভারতের ৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। ১৫০ পৃষ্ঠার খসড়া অভিযোগপত্রে ফরেনসিক বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ এবং অর্থপাচারের জটিল নেটওয়ার্কের বিস্তারিত বিবরণ যুক্ত করা হয়েছে। মামলার আলামত হিসেবে প্রায় ১০ হাজার পৃষ্ঠার নথি সংযুক্ত রয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত চূড়ান্ত অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করে বিচার শুরু হলে তা দেশের আর্থিক খাতে বড় ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে শক্ত বার্তা দেবে। সিআইডির সূত্র জানায়, অভিযুক্তদের তালিকায় সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান ছাড়াও আছেন আনিস এ খান, কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, শুভংকর সাহা, রেজাউল করিম, জোবায়ের বিন হুদা, এ এফ এম আসাদুজ্জামান, মেজবাউল হক, আবুল কাসেম এবং মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ। ভারতের তালিকায় রয়েছেন প্রিথাম রেড্ডি, সুধীন্দ্র আথ্রেশ, নীলাভান্নান মাদুক্কুর আনন্দন এবং রাশে আস্থানা।
মামলার সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। শতভাগ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে এখনো বিশ্লেষণ চলমান। অ্যাটর্নি জেনারেলের মতামতের পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, ৬০ জনের বেশি আসামির নাম চার্জশিটে থাকতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সিআইডি দেশি-বিদেশি বিপুল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে একটি নির্ভুল চার্জশিট তৈরির চেষ্টা করছে।
এর আগে তদন্তে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের সহায়তায় নর্থ কোরিয়ার হ্যাকার পার্ক জিন হিয়ক ও তার নেতৃত্বাধীন ‘লাজারাস গ্রুপ’-কে মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই সময়ে ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের মাধ্যমে পাচার হওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলারের গতিপথ শনাক্ত করা হয়।
তদন্ত সূত্র বলছে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট পেমেন্ট সিস্টেমে ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার চুরি করা হয়। ঘটনার প্রায় ৪০ দিন পর মতিঝিল থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর থেকে সিআইডি তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের মার্চে সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির তত্ত্বাবধানে তদন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।
২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় মামলার তদন্ত করেন সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান। তিনি দেশি-বিদেশি ৬৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার তথ্য সংগ্রহ করেন এবং চুরি হওয়া অর্থের একটি অংশ ফেরত আনার অগ্রগতি নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, মামলা দায়েরের ৪০ দিন পর তদন্ত শুরু হওয়ায় ঘটনাস্থলের প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন ছিল। তবুও ফিলিপাইন, ভারত ও জাপান থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। আরসিবিসি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দিগুতির জবানবন্দিও নেওয়া হয়, যেখানে একাধিক বিদেশি আসামির সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে আসে। তিনি আরও জানান, তদন্ত চলাকালে একাধিকবার বাংলাদেশের কিছু আসামির নাম বাদ দেওয়ার চাপ আসে, তবে তিনি তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো নাম বাদ দিতে রাজি হননি। পরে ২০২৩ সালের আগস্টে তাঁকে তদন্ত থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
২০২০ সালের নভেম্বরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে মামলার দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে তদন্ত কর্মকর্তাদের কিছু নির্দেশনা দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। ২০২২ সালে সিআইডি প্রধান পরিবর্তনের পর মামলার তদন্তে আরও কয়েক দফা সিদ্ধান্ত আসে। এর মধ্যে ফরেনসিক প্রতিবেদন বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানে পাঠানোর বিষয় নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
সিআইডির অতিরিক্ত আইজিপি মো. ছিবগাত উল্লাহ বলেন, তদন্ত দল দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে প্রায় সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে খসড়া অভিযোগপত্র তৈরি করেছে। এতে দেশি-বিদেশি সব আসামির অপরাধের ধরন স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। পর্যালোচনা কমিটির সূত্র বলছে, দীর্ঘ সাত বছরের বেশি সময় ঝুলে থাকা এই মামলার তদন্ত এগিয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। পরে সব তথ্য যাচাই শেষে চার্জশিটের খসড়া প্রস্তুত করা হয়। দীর্ঘ সময় পর রিজার্ভ চুরির মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনায় নতুন করে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

