দীর্ঘদিনের দাবি ও অপেক্ষার পর অবশেষে আগ্নেয়াস্ত্র পাচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সময় বারবার হামলা, গুলিবর্ষণ ও প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়ার প্রেক্ষাপটে সরকার তাদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ শেষ করে শিগগিরই অস্ত্র হাতে অভিযানে নামবেন কর্মকর্তারা।
দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাটি এতদিন বেশিরভাগ অভিযান পরিচালনা করেছে নিরস্ত্র অবস্থায়। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ সহযোগিতা দিলেও সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে কর্মকর্তাদের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে হামলা, গুলিবর্ষণ এবং সংঘর্ষে বহু কর্মকর্তা গুরুতর জখম হয়েছেন। প্রাণহানির ঘটনাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযানকালে মাদক কারবারিদের গুলিতে কর্মকর্তা আহত হওয়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারের অনুমোদনের পর অস্ত্র কেনার প্রক্রিয়া অনেকটাই শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে প্রথম ধাপে ২৭৫টি ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল সংগ্রহ করা হচ্ছে। যদিও মোট ৫৯৫টি অস্ত্র কেনার অনুমোদন রয়েছে, আপাতত সীমিত সংখ্যক অস্ত্র দিয়েই কার্যক্রম শুরু হবে।
অস্ত্র ব্যবহারের আগে কর্মকর্তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ধাপে ধাপে অংশ নিচ্ছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা। ইতোমধ্যে ২৬০ জন প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। উপপরিদর্শক থেকে শুরু করে পরিদর্শক, সহকারী পরিচালক এবং উপপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তারা এ প্রশিক্ষণের আওতায় এসেছেন। পর্যায়ক্রমে বাকি কর্মকর্তারাও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করবেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় ১৮ বছরে মাদকবিরোধী অভিযান চালাতে গিয়ে ১২৫ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী গুরুতর আহত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত দুজন সদস্য। অথচ একই সময়ে বিপুল পরিমাণ মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, ম্যাগাজিন ও গুলিও জব্দ করা হয়েছে। এসব পরিসংখ্যানই মাঠপর্যায়ে অস্ত্রের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করেছে।
তবে অস্ত্র হাতে পেলেও কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আগ্নেয়াস্ত্র হবে সর্বশেষ বিকল্প। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অন্য সব পদ্ধতি ব্যর্থ হওয়ার পরই কেবল অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। গুলিবর্ষণের আগে যতদূর সম্ভব সতর্কতা, ঘোষণা, লাঠিচার্জ বা অন্যান্য সীমিত বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে প্রথমে আকাশের দিকে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি ছুড়তে হবে। এরপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না এলে নির্দিষ্ট একজনের কোমরের নিচের অংশ, হাঁটু বা পায়ে লক্ষ্য করে একটি গুলি করা যাবে। কোনো অবস্থাতেই নির্বিচারে বা এলোপাথাড়ি গুলিবর্ষণের সুযোগ নেই। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, আবাসিক অঞ্চল কিংবা জনসমাগমস্থলে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুলি ছোড়ার সময় নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নিরীহ কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত না হন। একই সঙ্গে প্রতিটি গুলির হিসাব সংরক্ষণ, খোসা সংগ্রহ এবং পরবর্তী তদন্তে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা দেওয়ার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।
গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠানো, ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রাখা এবং আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর থাকবে। প্রতিটি ঘটনায় থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরির মাধ্যমে নথিভুক্ত করার নির্দেশনা রয়েছে।
অস্ত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব অস্ত্রাগার তৈরি না হওয়া পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের ট্রেজারি, পুলিশ লাইনস বা সংশ্লিষ্ট থানার অস্ত্রাগারে অস্ত্র রাখা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা তা গ্রহণ করে অভিযানে ব্যবহার করবেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অস্ত্র হাতে পাওয়ার ফলে শুধু আত্মরক্ষার সক্ষমতাই বাড়বে না, বরং মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তাদের ধারণা, এতে মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেফতারের হারও বাড়বে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসও বৃদ্ধি পাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, মাদকবিরোধী লড়াইয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জবাবদিহি, প্রশিক্ষণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা যেমন জরুরি, তেমনি নাগরিক নিরাপত্তা ও আইনের শাসন বজায় রাখাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

