পার্বত্যাঞ্চলের দুর্গম এলাকার কিছু তরুণ-যুবক লোভনীয় চাকরির আশ্বাসে অজান্তেই জড়িয়ে পড়ছেন বিপজ্জনক এক চক্রে। ভালো বেতন ও আকর্ষণীয় সুযোগের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে যুক্ত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে কাজ করছে একটি নিয়োগ নেটওয়ার্ক।
বান্দরবান, রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণদের লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়েছে এসব দালালচক্র। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ এবং নিয়মিত মাসিক বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে অনেককে সীমান্ত পার হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। গত দুই বছরে কয়েকশ তরুণ এভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে দেশটির জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে আসছে আরাকান আর্মি। বর্তমানে সংগঠনটি জনবল বাড়াতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার তরুণদের টার্গেট করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সীমান্তের ওপারে গোপনে একটি নিয়োগব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি বা দালালের মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। তবে এসব তরুণকে সেখানে সামরিক কাজে যুক্ত করা হচ্ছে, নাকি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে—তা নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বান্দরবানের পুলিশ সুপার মো. ওহাবুল ইসলাম খন্দকার বলেন, কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণকে ভালো চাকরি ও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে সীমান্তের ওপারে নিয়ে যাওয়ার তথ্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছেও রয়েছে। তবে তাঁরা সেখানে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন নাকি অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই। অবৈধভাবে রাখাইনে যাতায়াত বন্ধে দেশের সব নিরাপত্তা সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে। এদিকে সীমান্তে নজরদারি বাড়িয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কক্সবাজারের ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়ন আরাকান আর্মির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কয়েকটি অভিযান চালিয়েছে।
ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এস এম খায়রুল আলম জানান, এসব অভিযানে কয়েকজন বাংলাদেশি পাহাড়ি তরুণকে আটক করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। পরে তাঁদের স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে বিষয়গুলো নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, আরাকান আর্মি ও বাংলাদেশের কিছু ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিল থাকায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে পাহাড়ি এলাকার বেকারত্ব ও কর্মসংস্থানের সংকট যুক্ত হয়ে তরুণদের সহজেই প্রলোভনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, এসব তরুণকে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখতে সরকারের উচিত স্থানীয় পাহাড়ি নেতাদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন। সীমান্ত নিরাপত্তা ও তরুণদের নিরাপদ ভবিষ্যৎ—দুই দিক থেকেই বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল। কারণ, প্রলোভনের ফাঁদে পড়ে সীমান্ত পেরোনো তরুণরা শুধু নিজেরাই ঝুঁকিতে পড়ছেন না, তৈরি করছেন নতুন নিরাপত্তা উদ্বেগও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে বাংলাদেশি তরুণদের আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার কিছু যুবক চাকরি ও অর্থের প্রলোভনে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন—এমন তথ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ৩৪-পিলার সীমান্ত এলাকা থেকে তিনজনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। আটক ব্যক্তিরা সবাই বাংলাদেশি মার্মা সম্প্রদায়ের যুবক। তাঁরা হলেন রাঙামাটির রাজস্থলীর উয়ইমং মার্মা, বান্ডরবানের রুমার হলাচিং থোয়াই মার্মা ও গরাইমং মার্মা। তাঁদের কাছ থেকে ১ লাখ ৬৮ হাজার মিয়ানমারের কিয়াট উদ্ধার করা হয়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট নাইক্ষ্যংছড়ির তুমব্রু সীমান্ত এলাকা থেকে আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে আটক করে বিজিবি। তাঁদের একজন রাঙামাটি সদরের নয়ন চাকমা। বিজিবির দাবি, আটক ব্যক্তিরা আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য ছিলেন।
একই বছরের ২৩ মার্চ কক্সবাজারের খুরুশকুল তেতৈয়া ঘাট এলাকায় অভিযান চালায় র্যাব-১৫। অভিযানে আরাকান আর্মির ৬০ জোড়া ইউনিফর্মসহ তিন বাংলাদেশিকে আটক করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন শফিকা আকতার, মিনুয়া আকতার ও এক কিশোর।
রাখাইনে প্রভাব বাড়িয়েছে আরাকান আর্মি:
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে বর্তমানে ১৪টি আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের ২৭১ কিলোমিটার সীমান্তের বড় অংশেও জান্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়েছে বলে জানা গেছে।
আরাকান আর্মির প্রধান কমান্ডার তোয়ান ম্রাত নাইং ২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইন রাজ্যে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য জানিয়েছেন। তবে সংগঠনটির সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন হচ্ছে নতুন সদস্য। এ কারণে বাংলাদেশের পার্বত্যাঞ্চলের তরুণদের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বান্দরবান ও রাঙামাটির বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও চট্টগ্রামের লোহাগাড়া, সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ এলাকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণদের লক্ষ্য করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। তাঁদের দলে ভেড়াতে স্থানীয় পর্যায়ে এজেন্ট নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব এজেন্ট বেকার ও আর্থিক সংকটে থাকা তরুণদের উন্নত জীবন, ভালো বেতন এবং ভবিষ্যতে সরকারি চাকরির সুযোগের আশ্বাস দিচ্ছেন। রাখাইন স্বাধীন হলে সেখানে চাকরির সুযোগ মিলবে—এমন প্রলোভনও দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সীমান্তে সক্রিয় পারাপার নেটওয়ার্ক:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের অন্তত ২০টি পয়েন্ট ব্যবহার করে লোকজন পারাপার করছে আরাকান আর্মির সঙ্গে যুক্ত চক্র। এর মধ্যে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার ১১টি সীমান্ত পয়েন্ট রয়েছে।
টেকনাফের চাকমারকুলের কোয়ানচিবন, হোয়াইক্যংয়ের ডেউবুনিয়া, উনচিপ্রাংয়ের খোয়ারহালী, কাঞ্জরপাড়ার শালখালী, জীম্মনখালীর জিয়ানহালী, নয়াবাজারের কুয়ারবিল, হ্নীলার নাখপুরা, মুছনীর রাম্মাঘোনা, জাদীমুড়ার রংগাদন, নাইট্যংপাড়ার পেরানপুরু এবং ঘোলার পাড়ার মন্নিপাড়া এসব পয়েন্টের মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া উখিয়ার ভালুখিয়ার শিকদারপাড়া, বাইশপাড়ির নারাইনশন, খাইনখালীর চাকমাকাটা ও পালংখালীর লাম্মনহালী সীমান্ত পয়েন্ট দিয়েও পারাপারের অভিযোগ রয়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ফুলতলী, লম্বাশিয়া, ভালুরখাইয়া, চাকঢালা, দোছড়ি, উত্তরপাড়া ও বাইশফাঁড়ি এলাকাও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এককালীন টাকা ও মাসিক বেতনের প্রলোভন:
নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি, সোনাইছড়ি, ঘুমধুম ও বাইশারী ইউনিয়নের কয়েকজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই বছরে শুধু নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকা থেকেই কয়েক শ তরুণ অবৈধ পথে রাখাইনে গেছেন বলে তাঁদের ধারণা।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সীমান্তপারের এ কার্যক্রম পরিচালনায় একটি সংগঠিত সিন্ডিকেট কাজ করছে। তরুণদের প্রথমে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। পরে মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের রাখাইনে নেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর অনেককে স্বল্পমেয়াদি অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে তাঁদের বিভিন্ন সংঘাতে ব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও কথিত এজেন্টদের মাধ্যমে করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
২০২৬ সালের জুনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে, রাখাইনে সংঘর্ষে নাইক্ষ্যংছড়ির এক পাহাড়ি যুবক নিহত হয়েছেন। তাঁর নাম শুলু মার্মা ওরফে মংনু মার্মা বলে প্রচার করা হয়। তিনি নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ইউনিয়নের পশ্চিম বাইশারী গুদামপাড়ার বাসিন্দা বলে স্থানীয়রা জানান।
তবে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগে শুলু মার্মা আরাকান আর্মিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং সংগঠনটির মংডু এলাকার দায়িত্বে ছিলেন। আগে গোপনে বাড়িতে আসা-যাওয়া করলেও বর্তমানে তাঁর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে তাঁরা জানান।
পাহাড়ি তরুণদের সীমান্ত পেরিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীতে যুক্ত হওয়ার অভিযোগকে এখন নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক সংকট হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কর্মসংস্থানের অভাব, বেকারত্ব ও সচেতনতার ঘাটতি কাজে লাগিয়ে কোনো চক্র তরুণদের বিপদের পথে ঠেলে দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের তরুণদের স্বপ্ন, হতাশা ও অনিশ্চয়তাকে পুঁজি করে যদি কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের শক্তি বাড়াতে থাকে, তবে এর প্রভাব শুধু সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। একটি প্রজন্ম যদি কর্মসংস্থানের অভাব ও ভুল আশ্বাসের কারণে অজানা ভবিষ্যতের পথে পা বাড়ায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা ঠেকাতে রাষ্ট্র, সমাজ ও স্থানীয় নেতৃত্ব কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে?
আরাকান আর্মির নিয়োগ তৎপরতার অভিযোগ শুধু নিরাপত্তার সংকেত নয়, এটি পাহাড়ি জনপদের দীর্ঘদিনের আর্থসামাজিক সংকটেরও প্রতিচ্ছবি। সীমান্তে কড়া নজরদারির পাশাপাশি তরুণদের জন্য বাস্তব কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সচেতনতার সুযোগ তৈরি করা না গেলে প্রলোভনের ফাঁদ বারবার নতুন মুখ খুঁজে নেবে। কারণ সীমান্তের ওপারে হারিয়ে যাওয়া প্রতিটি তরুণ শুধু একটি পরিবারের নয়, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়েও বড় প্রশ্ন রেখে যায়।

