জাতীয় অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রাহিম বাংলাদেশে ডায়াবেটিস চিকিৎসার ক্ষেত্রে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (বাডাস) এবং বারডেম হাসপাতাল। দেশে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য আধুনিক ও সংগঠিত চিকিৎসাসেবার পথ তৈরি হয় এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, ডা. ইব্রাহিমের মূল লক্ষ্য ছিল রোগীর সেবা নিশ্চিত করা। তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। তবে বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও সেবার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
ডা. ইব্রাহিমের অন্যতম মূলনীতি ছিল—রোগীর কষ্ট কমানোই চিকিৎসকের প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতিষ্ঠিত কিছু প্রতিষ্ঠানে সেই মানবিক মূল্যবোধ থেকে বিচ্যুতি ঘটেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে উঠছে নানা অভিযোগ।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সহায়তা ও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সহযোগিতায় পরিচালিত হয়ে আসছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য ও স্বজনপ্রীতির মতো বিষয়গুলো জায়গা করে নিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। প্রতি মাসে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও কিছু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো, অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের স্থায়ী ক্যাম্পাস, নিজস্ব জমি ও প্রয়োজনীয় কিছু প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে জটিলতা রয়েছে। এ ছাড়া হাসপাতালের কিছু বিভাগে দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে এবং দক্ষতার চেয়ে অন্য বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির মহাসচিব হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করছেন মো. সাইফ উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পালনের সময়ের মধ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য সম্পদের মালিক হয়েছেন। তার সম্পদের বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফ উদ্দিন বলেন, তিনি সরকারি সচিব এবং ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার আয় বৈধ এবং সেই আয় থেকেই সম্পদ গড়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তিনি বাডাসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছেন। তার মতে, বর্তমানে মানুষ চাকরির প্রতি আগ্রহী হলেও স্বেচ্ছাসেবী দায়িত্ব পালনে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে।
বাডাসের প্রতিষ্ঠানগুলোকে অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হলেও কিছু রোগী ও স্বজন চিকিৎসা ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। পুরান ঢাকার বাসিন্দা শাহীন মিয়া জানান, তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিরাপদ প্রসবের জন্য বারডেম হাসপাতালের শিশু ও মহিলা বিভাগে ভর্তি করেন। অস্ত্রোপচারের পর স্ত্রী ও নবজাতক সুস্থ থাকলেও তাকে ১৫ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।
শাহীন মিয়ার দাবি, চিকিৎসা, ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কেবিন ভাড়াসহ মোট ব্যয় প্রায় তিন লাখ টাকা হয়। তার অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সময় হাসপাতালে রাখার কারণে ব্যয় বেড়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য এই অভিযোগের বিষয়ে পাওয়া গেলে তা পাঠকদের সামনে তুলে ধরা হবে।
ডা. মো. ইব্রাহিমের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমানে ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা ও রোগীবান্ধব সেবা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, তা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ পরিচালনায় বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং রোগীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
এক মাসে ১৬ কোটি টাকার ব্যয়, তদন্তে মিলছে না সন্তোষজনক ব্যাখ্যা:
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির (বাডাস) অধীন বারডেম জেনারেল হাসপাতালের আর্থিক হিসাব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের শেষ মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় এক মাসে অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য সামনে আসে। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করে ব্যয়ের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়।
বাডাস ন্যাশনাল কাউন্সিলের ৭১৬তম সভায় বারডেমের জুন মাসের হিসাব পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা যায়, ওই মাসে প্রায় ৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকার ঘাটতি রয়েছে। একই সময়ে ‘রিঅ্যাজেন্ট, ভোগ্যপণ্য (কনজ্যুমেবলস) ও অন্যান্য সামগ্রী’ খাতে ব্যয় দেখানো হয় ১৬ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই ব্যয় ছিল অস্বাভাবিক। কারণ এর আগের ১১ মাসে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত একই খাতে মাসিক ব্যয় ছিল গড়ে ৫ কোটি টাকার কম। ফলে মাত্র এক মাসে ব্যয় তিন গুণের বেশি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে ২০২৫ সালের ২৪ জুলাই বারডেমের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠায় বাডাস সচিবালয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো জবাব না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে তদন্ত কমিটি গত বছরের ১৩ আগস্ট ও ২৭ আগস্ট দুটি তাগিদপত্র পাঠায়। এরপর ২৮ আগস্ট বারডেম কর্তৃপক্ষ একটি প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম খান ও সদস্যরা জানান, বিষয়টি পরিষ্কার করতে বারডেমের অর্থ বিভাগের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করা হয়। তবে ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে হিসাব বিভাগ থেকে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে তারা জানান।
এ বিষয়ে বাডাসের মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন বলেন, সাড়ে ১৬ কোটি টাকার অস্বাভাবিক ব্যয়ের বিষয়ে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং কয়েকজনের চাকরিও শেষ হয়েছে।
বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটিকে অনুদান দেওয়া হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাডাস ২৮ কোটি টাকা সরকারি অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ ৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং পণ্য ও সেবা খাতে ২২ কোটি ৪০ লাখ টাকা বরাদ্দ ছিল।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ব্যাংক, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা, জাকাত তহবিল ও ব্যক্তিগত অনুদান থেকেও প্রতিষ্ঠানটি অর্থ সহায়তা পেয়ে থাকে। তবে অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা নেই। কিছু ক্ষেত্রে অডিট ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ:
বাডাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, এসব ক্ষেত্রে যোগ্যতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সুপারিশের প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিনের পরিবারের কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন বাডাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ গুরুত্বপূর্ণ পদেও ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়।
ন্যাশনাল হেলথকেয়ার নেটওয়ার্কের (এনএইচএন) কয়েকজন কর্মকর্তার দাবি, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই অনেক সময় লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যায়নি।
এনএইচএনের এক কর্মকর্তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানের ভেতরের অনিয়ম নিয়ে কথা বললে অনেক কর্মী সমস্যায় পড়েন। তার দাবি, প্রতিবাদের কারণে কেউ চাকরি হারিয়েছেন, আবার কাউকে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে বদলি করা হয়েছে। আরেক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, বাডাসের মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এম এ সামাদের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তার পদোন্নতি আটকে দেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
ডা. মো. ইব্রাহিমের হাতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে বর্তমানে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহিতা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং রোগীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে ব্যবহারের অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, দাতা সংস্থার নিয়ম এড়িয়ে এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর, অডিট প্রক্রিয়া নিয়ে অসতর্কতা এবং অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার মতো বিষয়গুলো ঘটেছে। সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনার ভিত্তিতে অভিযোগ করা হচ্ছে, ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এনএইচএনের কয়েকটি প্রকল্পের ব্যাংক হিসাবে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় অন্য একটি প্রকল্পের তহবিল থেকে ৫৮ লাখ টাকা সাময়িক ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, পূবালী ব্যাংকের হিসাবে পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্প—আঞ্চলিক ডায়াবেটিক সেন্টারের অবকাঠামো ও স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন প্রকল্প, সমাজসেবা ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্প এবং ডায়াবেটিস রোগীদের কাউন্সেলিং ও মানসিক সেবা প্রকল্পের অর্থ সংকট মেটাতে ‘মা ও শিশুর স্বাস্থ্য’ প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বরাদ্দ দেওয়া কোনো প্রকল্পের অর্থ অন্য স্বাধীন প্রকল্পে স্থানান্তর করলে দাতা সংস্থার শর্ত ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ম লঙ্ঘনের প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে বাডাসের মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন বলেন, এক প্রকল্পের অর্থ অন্য প্রকল্পে স্থানান্তরের সুযোগ নেই। তিনি দাবি করেন, বাডাসের সব হিসাব নিয়ম অনুযায়ী অডিট করা হয়।
বাডাসের অধীনে বিভিন্ন সময়ে দেশি-বিদেশি সহায়তায় একাধিক প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রকল্পে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একই ব্যক্তিদের ওপর বারবার নির্ভর করা হয়েছে। সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুদাননির্ভর প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিট ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নিরপেক্ষ তালিকাভুক্ত অডিটরের মাধ্যমে প্রতিবেদন তৈরি করে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত। পাশাপাশি সরকারি অডিট ব্যবস্থার আওতায়ও এসব প্রতিষ্ঠানের হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
প্রকল্পের অর্থ ফেরত এড়াতে ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ:
ডায়াবেটিস রোগীদের কাউন্সেলিং ও মানসিক সেবা প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে অব্যবহৃত অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, দাতা সংস্থাকে অর্থ ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে প্রকল্পের অর্থ দ্রুত ব্যয়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ প্রক্রিয়ায় কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি এবং দায়িত্ব পুনর্বণ্টন করা হয়। একজন জুনিয়র কর্মকর্তাকে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর পদোন্নতি দিয়ে সিনিয়র অফিসারের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে তার মাসিক বেতন ২৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার ৯৫৩ টাকা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ওই কর্মকর্তা একই সময়ে একাধিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দাতা সংস্থার অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রকল্প শেষে অব্যবহৃত অর্থ ফেরত দেওয়ার নিয়ম থাকে। তাই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
বাডাসের একটি প্রকল্পের অর্থ থেকে ব্যক্তিগত বিদেশ সফরের জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বাডাসের সিনিয়র গবেষণা সহকারী কাজী মরিয়ম জাহান যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়ার জন্য ভিসা, বিমান টিকিট ও অবস্থান খরচ বাবদ ২ লাখ ৩২ হাজার টাকা ‘মা ও শিশু যত্ন’ প্রকল্প থেকে ঋণ হিসেবে নেওয়ার আবেদন করেন।
নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ওই অর্থ দেওয়ার অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, জনকল্যাণমূলক কোনো প্রকল্পের অর্থ থেকে ব্যক্তিগত সফরের জন্য এ ধরনের ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে কি না। তাদের মতে, প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে দাতা সংস্থার নীতিমালা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বাডাস বর্তমানে আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নানা অভিযোগের মুখোমুখি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত অডিট প্রকাশ এবং কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটির প্রতি আস্থা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফ্ল্যাট কিনতে বাডাসের তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণের অভিযোগ:
অভিযোগ উঠেছে, বাডাসের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের তহবিল থেকেও ব্যক্তিগত প্রয়োজনে অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। নথিপত্রের বরাতে জানা যায়, ২০১৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সমিতির তৎকালীন সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান শেখের স্বাক্ষর করা একটি প্রত্যয়নপত্রে এক নারীকে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ১০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি অলাভজনক ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের তহবিল ব্যক্তিগত সম্পদ কেনার কাজে ব্যবহার করা হলে তা আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। তবে এ বিষয়ে বাডাস কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
বিআইএইচএস কর্মীদের চাকরিচ্যুতি নিয়ে মামলা:
বারডেমের অধীন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের (বিআইএইচএস) কয়েকজন কর্মীকে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় আদালতে মামলা হয়েছে। ভুক্তভোগী কর্মীদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাদের চাকরি বাতিল করা হয়েছে। তারা এ সিদ্ধান্তকে বেআইনি দাবি করে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন। ঢাকার প্রথম সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে এ-সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, চাকরি হারানোদের মধ্যে রয়েছেন টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রাশিদা আক্তার, জুনিয়র অ্যাটেনডেন্ট মো. কামরুল আহসান কামিম, জুনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মো. হাবিবুল্লাহ এবং জুনিয়র অ্যাটেনডেন্ট মো. বদরুল আলমসহ কয়েকজন কর্মী। তাদের দাবি, তারা দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। কারও চাকরির মেয়াদ ছিল ৫ বছর, আবার কারও ছিল ২৩ বছর পর্যন্ত। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তারা বিভিন্ন সময়ে পুরস্কারও পেয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাডাসের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, আর্থিক তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত অবস্থা স্পষ্ট নয়। এমনকি কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের দেনা রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব দেনার পরিমাণ ও আর্থিক অবস্থার বিষয়ে বাডাস কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক হিসাব যাচাই প্রয়োজন।
সরকার ও বিভিন্ন উৎস থেকে সহায়তা পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো কেন লাভজনক অবস্থায় যেতে পারছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে বাডাসের মহাসচিব মো. সাইফ উদ্দিন বলেন, সরকারি অনুদান মূলত বারডেম হাসপাতাল পেয়ে থাকে। তিনি বলেন, বারডেমের প্রায় ৭৫০ শয্যার মধ্যে ৩০ শতাংশ শয্যা দরিদ্র রোগীদের জন্য বিনামূল্যে রাখা হয়। এছাড়া ইনসুলিন ও ওষুধসহ বিভিন্ন সেবা বিনামূল্যে দেওয়া হয়। তার দাবি, গত বছরে বিনামূল্যে সেবা দিতে ডায়াবেটিক সমিতির ব্যয় হয়েছে ১১৩ কোটি টাকা।
সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি অনুদানের পরিমাণ বড় বিষয় নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ হলো অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘদিন লোকসানি দেখানোর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদের পরিমাণ বেড়ে গেলে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বৈধ আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, স্বাস্থ্য খাতে বাডাসের অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
ডা. মো. ইব্রাহিমের হাতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি দেশের স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহিতা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো এখন আলোচনার কেন্দ্রে। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন স্বাধীন নিরীক্ষা, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং রোগী ও সেবার স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
