Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice বৃহস্পতি, জুলাই 30, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » একটি দলিল, বহু হাত—জমি রেজিস্ট্রির অঘোষিত অর্থনীতির গল্প
    অপরাধ

    একটি দলিল, বহু হাত—জমি রেজিস্ট্রির অঘোষিত অর্থনীতির গল্প

    মনিরুজ্জামানUpdated:জুলাই 30, 2026জুলাই 30, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি রয়েছে। কোন খাতে কত টাকা দিতে হবে, তা নির্দিষ্ট করা আছে নিয়মে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। কাগজে-কলমে নির্ধারিত ফির বাইরে দলিল করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই অনিয়ম এখন জমি নিবন্ধন সেবার অন্যতম বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে।

    অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি এবং দলিল লেখকের নির্ধারিত সম্মানী ছাড়া অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু সেবা নিতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি দলিলের নকল সংগ্রহ করতেও অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ দিতে হচ্ছে গ্রাহকদের।

    অভিযোগ রয়েছে, এসব অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পাশাপাশি দলিল লেখক সমিতির তহবিলেও একটি অংশ জমা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

    জমি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দলিল লেখকরা। সাধারণত জমি ক্রেতা-বিক্রেতারা প্রথমে তাদের কাছেই যান। অনেক ক্ষেত্রে দলিল তৈরি থেকে শুরু করে নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্বও নেন তারা। আর এই সুযোগেই নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

    সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হলেও এর কোনো রসিদ দেওয়া হয় না। নিয়ম অনুযায়ী দলিল লেখকদের ফি তালিকা সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে দৃশ্যমান স্থানে টাঙিয়ে রাখার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় তা মানা হচ্ছে না। তবে দলিল লেখকদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি অনেক পুরোনো এবং বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের ভাষ্য, নির্ধারিত ফি অনুযায়ী একটি দলিল লিখে যে অর্থ পাওয়া যায়, তা দিয়ে কাজ চালানো সম্ভব নয়। তাই সেবাগ্রহীতাদের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে তারা অতিরিক্ত সম্মানী নেন।

    দলিল লেখকরা দাবি করেন, এই অর্থের একটি অংশ তাদের পেশাগত সংগঠনের বিভিন্ন কাজে ব্যয় করা হয়। তবে সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার বা অফিসের অন্য কর্মকর্তাদের জন্য অর্থ নেওয়ার অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছেন।

    সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রমাণ পাওয়া গেলে দলিল লেখকের সনদ বাতিলের বিধান রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ থাকলেও এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নজির খুব কম। অন্যদিকে, জমির দলিলের নকল সংগ্রহের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি সেবায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না।

    সরকার নির্ধারিত ফি কত, আর কত নিচ্ছেন দলিল লেখকরা?

    জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বিভিন্ন ধরনের ফি রয়েছে। সাফ কবলা (ক্রয়-বিক্রয়), দানপত্র, হেবা, বিনিময় দলিল, বণ্টননামা, বায়নাপত্র, চুক্তিপত্র, উইল, ওয়াকফ, ট্রাস্টসহ বিভিন্ন ধরনের দলিল নিবন্ধনের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর ও আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা হয়।

    নিয়ম অনুযায়ী, একটি দলিল নিবন্ধনের সময় নির্দিষ্ট কয়েকটি খাতে অর্থ পরিশোধ করতে হয়। সাধারণত ১০ পৃষ্ঠার একটি দলিলের ক্ষেত্রে সরকারি ফির মধ্যে রয়েছে—স্ট্যাম্প শুল্ক, রেজিস্ট্রেশন ফি, স্থানীয় সরকার কর, উৎসে কর, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভ্যাটসহ অন্যান্য নির্ধারিত ফি।

    জমির মূল্যের ওপর নির্ভর করে স্ট্যাম্প শুল্ক দিতে হয় ১ দশমিক ৫ শতাংশ। রেজিস্ট্রেশন ফি ১ শতাংশ। স্থানীয় সরকার কর দিতে হয় ২ থেকে ৩ শতাংশ। এর বাইরে হলফনামার স্ট্যাম্প বাবদ ৩০০ টাকা, এন ফি ২৪০ টাকা, এনএন ফি ৩৬০ টাকা, ই-ফি ১০০ টাকা এবং কোর্ট ফি ১০০ টাকা নির্ধারিত রয়েছে। সরকারি খরচ সম্পর্কে জানতে সেবাগ্রহীতারা ‘দলিল ফিস’ অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের তথ্য দিয়ে নিবন্ধনের সম্ভাব্য ব্যয় জেনে নিতে পারেন।

    দলিল লেখকদের জন্য নির্ধারিত ফি:

    দলিল লেখকদের ফি নির্ধারণ করে ২০০২ সালের ২৯ জুলাই আইন মন্ত্রণালয় থেকে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। সেই আদেশ অনুযায়ী, দলিল লেখকরা নির্দিষ্ট হারে পারিশ্রমিক নিতে পারবেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ৩০০ শব্দ বা তার অংশের খসড়া (মুসাবিদা) তৈরির জন্য ১৫ টাকা, খসড়া থেকে দলিল লেখা এবং নিবন্ধনসংক্রান্ত সহায়তার জন্য প্রতি ৩০০ শব্দে ১০ টাকা এবং স্মরণশক্তি থেকে দলিল তৈরি ও নিবন্ধন কাজে সহায়তার জন্য প্রতি ৩০০ শব্দে ১৫ টাকা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

    এ ছাড়া নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৫২ ধারার আওতায় কিছু নির্দিষ্ট কাজের জন্য আলাদা ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো পক্ষের অনুমোদিত ব্যক্তি হিসেবে মূল দলিল গ্রহণের জন্য ৫ টাকা, ছাপানো ফরম বা আবেদনপত্র পূরণের জন্য ৫ টাকা, প্রতিটি সমন লেখার জন্য ২ টাকা এবং নোটিশ লেখার জন্য ২ টাকা ফি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সূচি তল্লাশি বা বালামবহি পরিদর্শনের জন্য প্রতি বছর প্রতি ব্যক্তি বা সম্পত্তির ক্ষেত্রে ৫ টাকা ফি নির্ধারিত আছে।

    রসিদ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও মানা হচ্ছে না:

    ‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা, ২০১৪’ অনুযায়ী, দলিল লেখকদের নির্ধারিত ফি সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানাতে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের বাইরে দৃশ্যমান স্থানে সরকারি ফি তালিকা প্রদর্শনের কথা রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো দলিল লেখক নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ দাবি করলে তার সনদ বাতিলের বিধান রয়েছে। সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে ফি নেওয়ার পর তাকে রসিদ দেওয়াও বাধ্যতামূলক।

    এ ছাড়া ২০১১ সালের ১৮ আগস্ট আইন ও বিচার বিভাগ থেকে জারি করা আদেশে বলা হয়, দলিল লেখকদের পারিশ্রমিক নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে রসিদ দিতে হবে। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত ডায়েরি বা রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে। দলিল জমা দেওয়ার সময় ওই রসিদ সংযুক্ত করার নিয়ম রয়েছে। জেলা রেজিস্ট্রারের পরিদর্শনের সময়ও দলিল লেখকদের এই রসিদ দেখানোর কথা।

    তবে অভিযোগ রয়েছে, বাস্তবে এসব নিয়মের অনেকটাই মানা হচ্ছে না। নির্ধারিত ফির তালিকা প্রদর্শন এবং রসিদ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও অনেক জায়গায় তা কার্যকর নেই। ফলে জমি নিবন্ধন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থের চাপ বহন করতে হচ্ছে।

    অতিরিক্ত টাকা ছাড়া হয় না জমির দলিল, অভিযোগের কেন্দ্রে দলিল লেখকরা:

    জমি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়ায় সেবাগ্রহীতা ও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দলিল লেখকরা। নিয়ম অনুযায়ী, জমির দলিলের খসড়া তৈরি করে তা নিবন্ধনের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে উপস্থাপন করার দায়িত্ব তাদের।

    কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, দলিল লেখকদের এড়িয়ে জমি নিবন্ধন করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। অভিযোগ রয়েছে, নির্ধারিত ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দলিল সম্পন্ন করতে নানা ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল লেখকদের মধ্যে এ বিষয়ে এক ধরনের অলিখিত নিয়ম চালু রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

    পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কালিশুরী এলাকার বাসিন্দা মো. ইলিয়াস হাওলাদার জমি নিবন্ধনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, তিনি ৮ কড়া (আধা শতক) জমি কিনেছেন। প্রতি কড়া ১ লাখ ৩১ হাজার টাকা হিসাবে জমির দাম দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১০ লাখ টাকা। সব খরচ মিলিয়ে দলিল লেখককে দিতে হয়েছে ১ লাখ টাকা।

    ইলিয়াসের অভিযোগ, সরকারি ফি সম্পর্কে জানতে চাইলে দলিল লেখক জানান, দলিল লেখার জন্য তাকে মাত্র ২ হাজার টাকা দিলেই হবে, বাকি অর্থের বিষয়ে তিনি যেন ব্যবস্থা করেন। পরে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, সরকারি হিসাবে দলিল নিবন্ধনের খরচ প্রায় ৮০ হাজার টাকার মতো হলেও দলিল লেখককে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে।

    পটুয়াখালীর গলাচিপা, দশমিনা ও বাকেরগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে তারা জমির মূল্যের ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নিয়ে থাকেন। বিনিময়ে জমি নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়ার দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান তারা।

    পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি গ্রামের রহমান প্যাদা ৮ শতাংশ জমি কেনার জন্য এক দলিল লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জমির দাম নির্ধারণ হয় সাড়ে ৩ লাখ টাকা। ওই দলিল লেখক জমির মোট মূল্যের ১০ শতাংশ হিসাবে ৩৫ হাজার টাকা দাবি করেন। হিসাব অনুযায়ী, ওই জমি নিবন্ধনের সরকারি ফি হওয়ার কথা ২৭ হাজার ২৬০ টাকা।

    এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক কামরুল ইসলাম পাভেল বলেন, সরকার নির্ধারিত ফি দিয়ে বর্তমান সময়ে কাজ চালানো কঠিন। তার দাবি, নির্ধারিত অর্থে যাতায়াত খরচও মেটে না। তবে তারা কাউকে বাধ্য করে অতিরিক্ত ফি নেন না।

    অতিরিক্ত অর্থ কোথায় যায়?

    দলিল লেখকদের নেওয়া অতিরিক্ত অর্থের বিষয়ে সাধারণত কোনো স্বচ্ছ হিসাব পাওয়া যায় না। তবে দেশের বিভিন্ন এলাকার দলিল লেখক ও নকলনবিশদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব অর্থ বিভিন্ন খাতে ভাগ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, জমির মূল্য অনুযায়ী সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, জেলা রেজিস্ট্রার, দলিল লেখক সমিতি এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের জন্য অর্থ রাখা হয়।

    কয়েকজন দলিল লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকার কম মূল্যের দলিলের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের জন্য কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। জমির মূল্য বেশি হলে প্রতি লাখ টাকার হিসাবেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি জেলা রেজিস্ট্রারের জন্য ১০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং দলিল লেখক সমিতির জন্য ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তারা।

    নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার বলেন, ওই অফিসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০০টি দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতিটি দলিলের বিপরীতে ‘সেরেস্তা’ খাতে ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়, যা অফিসের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভাগ হয়। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে বছরে প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার দলিল নিবন্ধন হয়। ফলে বিভিন্ন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়।

    নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ দলিল নিবন্ধন হয়। প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার দলিল নিবন্ধনের কাজ সম্পন্ন হয়। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দলিলের ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে আদায় হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

    দুর্নীতি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে করা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) জাতীয় খানা জরিপেও জমি নিবন্ধন খাতে অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া অনেক সেবাগ্রহীতা জানিয়েছেন, দলিল নিবন্ধনের কাজে তাদের অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়েছে।

    টিআইবির ২০১২ সালের জরিপে দলিল নিবন্ধন সংক্রান্ত কাজে গড়ে ঘুষের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৫৩ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৭৭৭ টাকা এবং ২০১৭ সালের জরিপে তা আরও বেড়ে হয় ১১ হাজার ৮৫২ টাকা। ফলে জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সেবায় নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও এর কার্যকর সমাধান এখনো হয়নি।

    দলিল লেখক সমিতির তহবিলেও অস্বচ্ছতার অভিযোগ:

    জমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ শুধু দলিল লেখকদের ব্যক্তিগত ফি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। অভিযোগ রয়েছে, দলিল লেখক সমিতির কল্যাণ তহবিলের নামেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। বছরের পর বছর ধরে এই তহবিলে কোটি কোটি টাকা জমা হলেও এর ব্যবহারে স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দলিল লেখকদের ভাষ্য, প্রতিটি দলিল থেকে সমিতির নামে ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। বড় অঙ্কের দলিল হলে এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

    তবে সাধারণ দলিল লেখকদের অভিযোগ, সমিতির নেতৃত্বে থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কারণে অনেক সময় ইচ্ছার বিরুদ্ধেও চাঁদা দিতে হয়। পরে সেই অর্থ দলিল লেখার ফি’র সঙ্গে যুক্ত করে সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে আদায় করা হয়। নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার অভিযোগ করেন, জমি কেনার নামে সমিতির মাধ্যমে দলিল লেখকদের কাছ থেকে প্রায় ৭ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলেও এর কোনো হিসাব সদস্যদের দেওয়া হয়নি।

    তিনি বলেন, ঈদ বোনাসসহ সমিতির বিভিন্ন তহবিলের অর্থও সঠিকভাবে বণ্টন করা হয়নি। অতীতে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সমিতির অর্থ অপব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

    আলমগীর সরকারের দাবি, শুধু নরসিংদী নয়, দেশের অনেক দলিল লেখক সমিতিতেই একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। কার্যকর গঠনতন্ত্র, সরকারি নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা না থাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এসব সংগঠন নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাচ্ছেন।

    এ বিষয়ে আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, দলিল লেখকদের ফি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কীভাবে বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তা দেখা হচ্ছে। রেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও সিন্ডিকেটের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, সমিতিকে কেন্দ্র করে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। এটি ভাঙা সহজ নয়। বিষয়টি তারা পর্যবেক্ষণ করছেন।

    নকল তুলতেও বাড়তি অর্থের অভিযোগ:

    মূল দলিল হাতে পেতে অনেক সময় কয়েক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। এ কারণে জরুরি প্রয়োজনে অনেকেই দলিলের নকল বা সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহ করেন। কিন্তু এই নকল সংগ্রহ করতেও নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

    নিয়ম অনুযায়ী, ১০ পৃষ্ঠার একটি নকল তুলতে সরকারি ফি ৬২০ টাকা। এর মধ্যে নকল প্রস্তুতের জন্য প্রতি পৃষ্ঠা ২৪ টাকা হিসাবে ২৪০ টাকা, নকলনবিশের পারিশ্রমিক প্রতি পৃষ্ঠা ৩৬ টাকা হিসাবে ৩৬০ টাকা এবং আবেদনপত্রের কোর্ট ফি ২০ টাকা রয়েছে।

    জরুরি ভিত্তিতে নকল নিতে চাইলে অতিরিক্ত ২০০ টাকা ফি দিতে হয়। এর মধ্যে জরুরি আবেদনের জন্য ৫০ টাকা এবং প্রতি পৃষ্ঠা ১৫ টাকা হিসাবে ১৫০ টাকা অন্তর্ভুক্ত কিন্তু সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, বাস্তবে একটি নকল সংগ্রহ করতে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হচ্ছে।

    পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার মাছুয়াখালী এলাকার বাসিন্দা শাহরিয়ার হোসেন রানা বলেন, পরিচিত একজনের মাধ্যমে নকল তুলতে গিয়ে তাকে আড়াই হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

    রেজিস্ট্রি অফিসে নানা অনিয়মের অভিযোগ:

    জমির দলিল ও নকলের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পাশাপাশি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে আরও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—জাল দলিল নিবন্ধন, দলিলে ভুল বা মিথ্যা তথ্য সংযোজন, জমির প্রকৃত শ্রেণি ও মূল্য গোপন করে কম দেখানো এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে দলিল সম্পন্ন করা। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের যোগসাজশে এসব অনিয়ম চলে।

    নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক আলমগীর সরকার অভিযোগ করেন, ওই অফিসে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনিয়ম চলে আসছে। এসবের বিরুদ্ধে কথা বললে অনেককে হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

    তার অভিযোগ, ২০২১ সালে ওই অফিসের এক নকলনবিশের বিরুদ্ধে সরকারি পে-অর্ডারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এক বছরের হিসাবেই প্রায় ১৯ কোটি টাকা অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকারি কর্মচারীদের পরিবর্তে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নকলনবিশদের হাতে থাকায় জবাবদিহি কমে যাচ্ছে এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

    নরসিংদী সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের এক নকলনবিশের বিরুদ্ধে দলিল লেখকের স্বাক্ষর জাল করে দলিল সম্পন্ন করা এবং সাব-রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর জাল করে রসিদ বিতরণের অভিযোগও উঠেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকরা সাব-রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

    দুর্নীতি ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন: টিআইবি

    ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, জমি নিবন্ধন সেবা নিতে গিয়ে অনেক মানুষ নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে অনেক সেবাগ্রহীতার অভিজ্ঞতা হলো—অবৈধ লেনদেন ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন।

    টিআইবির বিভিন্ন বছরের জাতীয় খানা জরিপেও জমি নিবন্ধন খাতে দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০১২ সালে দলিল নিবন্ধন সংক্রান্ত কাজে গড়ে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৬৫৩ টাকা। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৯ হাজার ৭৭৭ টাকা এবং ২০১৭ সালে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৮৫২ টাকা।

    সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়গুলোতে অনিয়ম, সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগের পর সম্প্রতি নিবন্ধন অধিদপ্তর থেকে ১০ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সকাল ৯টার মধ্যে অফিসে উপস্থিত থাকা, অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ না করা এবং প্রতিদিনের কাজ সেদিনই শেষ করার কথা বলা হয়েছে।

    এ ছাড়া দলিল, বালাম ও অন্যান্য নিবন্ধন কার্যক্রমে কোনো ধরনের বকেয়া না রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশজুড়ে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ দলিলের নকল বকেয়া থাকায় দ্রুত তা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে জেলা রেজিস্ট্রার ও সাব-রেজিস্ট্রারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নকলনবিশদের কাজ নিয়মিত মূল্যায়ন এবং টানা তিন মাস মানসম্মত কাজ না করলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

    ভূমি সংক্রান্ত সব কাজ ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলেও জমি নিবন্ধনের দায়িত্ব রয়েছে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ফলে একই সেবার জন্য মানুষকে দুই মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিভিন্ন দপ্তরে যেতে হয়। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ভূমি নিবন্ধন কার্যক্রম ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে এ কার্যক্রম পরিচালিত হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির কারণে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

    জমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় দলিল লেখকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশে তাদের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ হাজার দলিল লেখক রয়েছেন।

    ‘দলিল লেখক (সনদ) বিধিমালা, ২০১৪’ অনুযায়ী, জেলা রেজিস্ট্রার দলিল লেখকদের সনদ দিয়ে থাকেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ৩০০টি নিবন্ধিত দলিলের জন্য একজন দলিল লেখক থাকার কথা। তবে বাস্তবে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দলিল লেখক রয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২০ সালের আগে ব্যাপকহারে দলিল লেখকের সনদ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে নতুন করে সনদ দেওয়া প্রায় বন্ধ রয়েছে।

    ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ বলেন, জেলায় প্রয়োজনের তুলনায় দলিল লেখকের সংখ্যা বেশি। সদর এলাকায় যেখানে ৩০ জন থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে প্রায় ৫০ জন রয়েছেন। নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ৩০০টি দলিলের বিপরীতে একজন দলিল লেখক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় প্রয়োজনের তিন থেকে চার গুণ বেশি দলিল লেখক রয়েছেন।

    দলিল লেখকদের নির্ধারিত ফি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছেন আইন মন্ত্রণালয় ও নিবন্ধন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কম ফি নির্ধারণ থাকায় বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না এবং এর সুযোগে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের হার বিধিমালায় নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু সেই হার এত কম যে বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন।

    তিনি বলেন, এক পৃষ্ঠার জন্য ১০ থেকে ১৫ টাকা নির্ধারণ থাকলে ১০ পৃষ্ঠার একটি দলিল লিখে ৬০ থেকে ৭৫ টাকা দিয়ে একজনের জীবন চালানো সম্ভব নয়। তার মতে, সরকার যদি দলিল লেখকদের জন্য বাস্তবসম্মত পারিশ্রমিক নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।

    তিনি বলেন, বর্তমানে সিটিজেন চার্টারে সরকারি ফি উল্লেখ থাকে। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ সরাসরি সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে না গিয়ে প্রথমেই দলিল লেখকের কাছে যান। ফলে অনেক সময় তারা অফিসারের নাম ব্যবহার করে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেন।

    আশরাফুজ্জামান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানেনও না যে তার নাম ব্যবহার করে টাকা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের ধারণা হয়, এই অতিরিক্ত অর্থ সাব-রেজিস্ট্রারের জন্যই নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, জমি নিবন্ধনে স্ট্যাম্প, ব্যাংক, অনুমোদন, দলিল লেখকসহ বিভিন্ন খাতে খরচ হয়। সব খরচ একসঙ্গে হিসাব করে মানুষ মনে করেন রেজিস্ট্রি অফিসেই পুরো অর্থ দিতে হয়েছে।

    রেজিস্ট্রি অফিসের দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে নিবন্ধন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক বলেন, সব কর্মকর্তা একই ধরনের নন। অনেক কর্মকর্তা সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেন, প্রায় ৫০০ কর্মকর্তার মধ্যে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। তবে কয়েকজনের কারণে পুরো বিভাগের সবাইকে দায়ী করা ঠিক নয়।

    জমি নিবন্ধনে সাধারণ মানুষের হয়রানির অভিযোগের বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তার মতে, দলিল লেখকদের নির্ধারিত ফি অনেক কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সেটি মানা হচ্ছে না। তবে দলিল লেখকদের অতিরিক্ত ফি’র একটি অংশ সাব-রেজিস্ট্রার বা জেলা রেজিস্ট্রারদের কাছে যায়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

    ভোলার জেলা রেজিস্ট্রার মো. নুর নেওয়াজ বলেন, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলোতে কিছু অনিয়ম রয়েছে। এসব কমাতে অফিসগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। তার মতে, দলিল লেখকদের ফি বাস্তবসম্মত করা হলে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার প্রবণতাও কমবে। তিনি বলেন, অনেক সময় দলিল লেখকরা কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে মানুষের কাছ থেকে অর্থ নেন। তাই দলিল লেখকদের কার্যক্রম আরও কঠোর নিয়মের মধ্যে আনা প্রয়োজন।

    ৫ হাজার টাকা সম্মানী চান দলিল লেখকরা:

    বাংলাদেশ দলিল লেখক সমিতির সভাপতি এম এ রশিদ বলেন, বর্তমানে দলিল লেখকদের ফি ১০ টাকা, ১৫ টাকা বা ২ টাকার মতো বিভিন্ন হারে নির্ধারিত রয়েছে। এই ফি বাড়ানোর দাবি জানিয়ে তারা কর্মসূচি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, অনেক সময় ২০ থেকে ২৫ পৃষ্ঠার দলিল লিখতে হয়। তাই দলিলপ্রতি ৫ হাজার টাকা সম্মানী নির্ধারণের দাবি তাদের।

    তিনি আরও বলেন, দাবি পূরণ না হলে কর্মসূচি বা কর্মবিরতির মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। তবে দলিল লেখকদের অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ সাব-রেজিস্ট্রার, জেলা রেজিস্ট্রার বা সমিতির তহবিলে জমা হয়—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি। এম এ রশিদ বলেন, দলিল লেখকরা যে ফি নেন, তা নির্দিষ্টভাবেই নেওয়া হয়। কারও নামে আলাদা করে টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই।

    জমি নিবন্ধনে দুর্নীতি এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে:

    জমি নিবন্ধন সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এই খাতে দুর্নীতি এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জমি নিবন্ধন সেবা নিতে গিয়ে দেশের মানুষ অনেক ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফির চেয়ে বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের অভিজ্ঞতা হলো, ঘুষ বা অনৈতিক লেনদেন ছাড়া অনেক সময় সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

    তিনি বলেন, বর্তমানে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যেখানে দুর্নীতিকে অনেকেই স্বাভাবিক বিষয় হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। এটি শুধু কোনো একক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তির মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে একটি কাঠামো তৈরি হয়েছে।

    টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পর সেই টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ হয়। কার কত অংশ থাকবে, সেটিও এক ধরনের অলিখিত নিয়মে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, এই সমস্যা শুধু স্থানীয় নিবন্ধন কার্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোরও নজরদারির ভূমিকা রয়েছে। তবে অনেক সময় নজরদারির জায়গাতেও দুর্বলতা দেখা যায়।

    দলিল লেখকদের ভূমিকা সম্পর্কে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তারা সরকারি কর্মচারী নন। কিন্তু নিবন্ধন কার্যালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া দলিল লেখকদের পক্ষে দীর্ঘদিন এ ধরনের অনিয়ম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ ও টিআইবির গবেষণায় দেখা গেছে, দলিল লেখক, মধ্যস্বত্বভোগী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছেন। তাদের মাধ্যমে আদায় করা অবৈধ অর্থের একটি অংশ সরকারি প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছেও পৌঁছানোর অভিযোগ রয়েছে।

    জমি নিবন্ধন খাতে দুর্নীতি কমাতে সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বৈধ আয় ও সম্পদের হিসাব যাচাই করা হলে অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করা সম্ভব। একই সঙ্গে তাদের পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের সম্পদের তথ্যও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তার মতে, শুধু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেই হবে না, পুরো ব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

    জমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে পুরো প্রক্রিয়াকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ডিজিটাল করার পরামর্শ দিয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সেবা ব্যবস্থাকে বিকেন্দ্রীকরণ এবং ডিজিটালাইজেশন করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।

    তবে তার অভিযোগ, বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধাভোগী একটি অংশ প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ধীরগতিতে এগোচ্ছে। টিআইবির মতে, জমি নিবন্ধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে শুধু মাঠপর্যায়ে নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন।

    দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই অঘোষিত লেনদেনের সংস্কৃতি ভাঙা সহজ নয়। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার, কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর জবাবদিহি ছাড়া এই খাতের সংকট কাটবে না। এখন প্রশ্ন হলো—মানুষের জমির অধিকার নিশ্চিত করার এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাকে কি সত্যিই দুর্নীতিমুক্ত করা হবে, নাকি অদৃশ্য খরচের বোঝা আরও দীর্ঘ হবে?

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অপরাধ

    স্বপ্নের বিদেশযাত্রা যেভাবে পরিণত হচ্ছে মানব পাচারের ফাঁদে

    জুলাই 30, 2026
    অপরাধ

    চট্টগ্রামে চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য

    জুলাই 30, 2026
    অপরাধ

    দুর্নীতির বলয় ভেঙে ফিরুক সুশাসন

    জুলাই 30, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.