ইতালিতে ভালো জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে লাখ লাখ টাকা। প্রতিশ্রুতি ছিল ইতালি পাঠানোর, কিন্তু বাস্তবে তাদের পাঠানো হয়েছে লিবিয়ায়, তুলে দেওয়া হয়েছে সেখানকার একটি মানব পাচারকারী চক্রের হাতে।
ফলাফল—প্রায় দশ মাস ধরে দেশে ফিরতে পারছেন না অন্তত পঁয়ষট্টি জন বাংলাদেশি তরুণ। এই ভয়াবহ পাচার চক্রের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে অভিযোগ উঠেছে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার দক্ষিণ গোপালপুর গ্রামের বাসিন্দা খন্দকার হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। একসময় তিনি ডাসার উপজেলার ধজি হামিদিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাসে প্রায় পঁচিশ হাজার টাকা বেতনের সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাবিবুর মাদারীপুরের কালকিনির দক্ষিণ গোপালপুর গ্রামের খন্দকার আলমগীর হোসেনের ছেলে এবং তিনি ডাসারের গোপালপুরের ওই মাদ্রাসাতেই শিক্ষকতা করতেন। এলাকাবাসীর কাছে তিনি এখন পরিচিত ‘মানব পাচারের ডন’ নামে। মাত্র দুই বছরে অবৈধ আয়ে ফুলেফেঁপে ওঠার পর প্রায় ছয় মাস আগে তিনি স্বেচ্ছায় মাদ্রাসার চাকরি থেকে পদত্যাগ করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, বিশ লাখ টাকার বিনিময়ে সরাসরি ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হাবিবুর। কিন্তু বাস্তবে তরুণদের ইতালির বদলে লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা হয় এবং সেখান থেকে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় আরও লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। ডাসার উপজেলার বনগ্রামের বাসিন্দা ইব্রাহিম ঘরামির ছেলে হাবিবুলকে ইতালি নেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে এককালীন বিশ লাখ টাকা নেওয়া হয়।
কিন্তু প্রায় এক বছর ধরে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরও পাঁচ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ। একইভাবে রামনগর গ্রামের নুরু সরদারের ছেলে সিফাত সরদারকে ইতালি পাঠানোর নামে নেওয়া হয় বাইশ লাখ টাকা, তিনিও প্রায় দশ মাস ধরে লিবিয়ায় বন্দি রয়েছেন। একই পরিণতি হয়েছে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর গ্রামের হাবিব হাওলাদারের ছেলে সাগর এবং মাদারীপুরের কালকিনির পশ্চিম শিকারমঙ্গল গ্রামের আক্তার ব্যাপারীর ছেলে ফয়সাল হোসেনসহ অন্তত পঁয়ষট্টি জন তরুণের।
স্বজনরা এখনো জানেন না তাঁদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে ঠিক কী ঘটেছে, এই উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। উপায়ান্তর না দেখে ভুক্তভোগীদের পরিবার গত ২৬ জুলাই হাবিবুরের বাড়ি ঘেরাও করে বিচার দাবি করেন। পরে পুলিশ এসে তাঁদের থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের পরামর্শ দেয়। এরপর থেকে প্রতিদিনই মানুষ তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন, সোমবার বিকেলেও সেখানে ভুক্তভোগীদের অনেক স্বজনকে দেখা গেছে।
হাবিবুলের নানি জানান, তিনি বহুবার হাবিবুরের বাড়িতে গেছেন, কিন্তু কোনো সন্তোষজনক জবাব পাননি। তাঁর ভাষ্যমতে, হাবিবুর নিজেও বাড়িতে থাকেন না এবং তাঁরা এখন সম্পূর্ণ অসহায় অবস্থায় বিচারের অপেক্ষায় আছেন। সিফাতের বড় ভাইও একই ধরনের অভিযোগ করে বলেন, তাঁর ভাইকে বন্দি করে রেখে না মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, না টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে, তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা হাবিবুরের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন, যদিও হাবিবুর নিজে বাড়িতে নেই, আছেন শুধু তাঁর স্ত্রী। সাগরের মা জানান, বাইশ দিনের মধ্যে ছেলেকে ইতালি পাঠানোর কথা বলা হলেও এখন তাঁকে লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং ফোনে ছেলে শুধু কান্নাকাটি করে। ফয়সালের মা জানান, চুক্তির চেয়েও সাত লাখ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে, তবু তাঁর ছেলে এখনো বন্দি এবং তাকে না খাইয়ে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, গত দুই বছরে হাবিবুরের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রায় পঞ্চাশ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। বিষয়টি নজরে আসার পর তাঁর চারটি ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মানব পাচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার সন্দেহে এসব হিসাবের অস্বাভাবিক লেনদেন খতিয়ে দেখা শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সংশ্লিষ্ট একটি ব্যাংকের স্থানীয় শাখা ব্যবস্থাপক নিশ্চিত করেছেন যে হাবিবুরের হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক তা জব্দ করেছে। আরেকটি ব্যাংকের উপশাখা ইনচার্জও জানিয়েছেন, সিআইডির পাঠানো চিঠির মাধ্যমেই বিষয়টি তাঁদের নজরে আসে।
সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ জানান, ব্যক্তিগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে প্রায় ছয় মাস আগে হাবিবুর পদত্যাগ করেন, তার আগে তিনি দীর্ঘদিন মাদ্রাসায় অনুপস্থিত ছিলেন। পরে জানা যায়, তিনি মানব পাচার কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত খন্দকার হাবিবুর রহমান মুঠোফোনে দাবি করেন, ব্যাংক হিসাব জব্দ হওয়ায় কিছুটা সমস্যায় পড়েছেন তিনি। লিবিয়ায় আটকে থাকা তরুণদের দ্রুত মুক্ত করে ইতালি পাঠানোর চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি, পাশাপাশি দাবি করেন যে তিনি কারও টাকা আত্মসাৎ করবেন না এবং কোথাও পালিয়েও যাবেন না।
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীদের থানায় লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করতে বলা হয়েছে এবং অভিযোগ পাওয়া মাত্রই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

