দরপত্রের নির্ধারিত শর্তাবলি পূরণ না হওয়া সত্ত্বেও এক ঠিকাদারকে ঊনিশ কোটি টাকার একটি কাজ দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালার সরাসরি লঙ্ঘন। নকশা ও ডিজাইনের বাইরে অতিরিক্ত কাজ দেখিয়ে ওই ঠিকাদারকে বিয়াল্লিশ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির অনুমোদন ছাড়াই পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করে তিরাশি লাখ টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে, আর ভূমি ভরাটের কাজ শুরুর আগেই দেড় কোটি টাকার বেশি অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের হাতে। এভাবে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোট প্রায় ষাট কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা ঊনত্রিশটি অডিট আপত্তিতে ধরা পড়েছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, চলতি বছরের জুনের শেষে প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত একটি অডিট আপত্তিরও নিষ্পত্তি হয়নি। অথচ প্রকল্প এলাকায় সারাদিন পানি সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তবে অধিকাংশ বাসিন্দা দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টার বেশি পানি পাচ্ছেন না।
এটি কোনো সাধারণ প্রকল্প নয়—দেশের ত্রিশটি পৌরসভায় নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে বাস্তবায়িত একটি বড় প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র এটি। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন সংস্থার এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছিল।
এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের একজন সম্মাননীয় ফেলো বলেন, এ ধরনের প্রকল্পের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। জনগণের করের অর্থে দেশের উন্নয়নকাজ পরিচালিত হয়, তাই এভাবে অনিয়ম করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যারা নিয়ম না মেনে এভাবে অর্থ খরচ করেছে, তাদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, বারবার বিলম্বের কারণে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, আর রাষ্ট্রের অর্থেরও বড় ক্ষতি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প অনুমোদনের পর থেকে প্রতি অর্থবছরেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং তা ব্যয়ও করা হয়েছে। ছয়টি অর্থবছর জুড়ে মোট ঊনত্রিশটি অডিট আপত্তিতে প্রায় ষাট কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর মধ্যে বাজারদরের চেয়ে অস্বাভাবিক বেশি দামে ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি কেনার প্রমাণ মিলেছে। শুধু তা-ই নয়, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হওয়ার আগেই সমাপ্তি প্রতিবেদন তৈরি করে অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যা সরকারি আর্থিক শৃঙ্খলার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এমনকি কাগজে-কলমে আবাসিক প্রকৌশলীর পারিশ্রমিক দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত মান উন্নয়নে ত্রিশটি পৌরসভায় নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন সেবা সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। তখন সাড়ে চার বছর মেয়াদে, অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় সতেরোশ একান্ন কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ছিল প্রায় আশি কোটি টাকা, আর বাকি অংশ আসার কথা ছিল বিশ্বব্যাংক ও এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংকের ঋণ থেকে।
কাজের ধীরগতির কারণে পরবর্তীতে দুই দফা সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়, একই সঙ্গে মোট ব্যয় কমিয়ে প্রায় ষোলোশ ছিয়ানব্বই কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়। এই মেয়াদের মধ্যে মোট তেরোশ নব্বই কোটি টাকা খরচ হয়েছে, অর্থাৎ আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে তিরাশি শতাংশে, আর ভৌত অগ্রগতি পঁচানব্বই শতাংশ। প্রতিবেদন বলছে, শুরুতে দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাই প্রক্রিয়ার কারণেই পরবর্তী সময়ে একের পর এক ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় মোট তিনশ বাইশটি কাজের প্যাকেজ থাকার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে তিনশ এগারোটির জন্য। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ছিল ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্থাপন, গণশৌচাগার নির্মাণ, কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, টেকসই ল্যাট্রিন নির্মাণ, এ ছাড়া সড়ক নির্মাণ, সড়কবাতি ও শিশুপার্কের উন্নয়নও।
ত্রিশটি পৌরসভায় একশ এগারো কিলোমিটার ড্রেনেজ ব্যবস্থা স্থাপনের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবায়িত হয়েছে একশ এক কিলোমিটার, যাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় দুইশ চৌষট্টি কোটি টাকা। অধিকাংশ পৌরসভায় পানির লাইন ও মিটার বসানো হলেও এখনো সংযোগ পুরোপুরি চালু হয়নি, ফলে নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। কিছু এলাকায় পাম্পের ত্রুটির কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে, আবার কোথাও অনিয়মিতভাবে দিনে মাত্র দুই বেলা পানি সরবরাহ করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীদের প্রকৃত চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
ষাটটি গণশৌচাগার নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে বাস্তবে নির্মিত হয়েছে মাত্র ঊনত্রিশটি, যার অগ্রগতি পঁচাশি শতাংশ। ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে অগ্রগতি নব্বই শতাংশ বলে দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ত্রিশ পৌরসভার জন্য চারটি প্যাকেজে মোট এক লাখ একহাজার সাতশ চুয়ান্নটি পানির মিটার কেনা হয়, যাতে ব্যয় হয়েছে প্রায় চল্লিশ কোটি টাকা। প্রায় একাশি শতাংশ বাড়িতে মিটার বসানো হলেও তার মধ্যে চল্লিশ শতাংশই চুরি হয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের অগ্রগতি তদারকির জন্য বছরে চারটি করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির সভা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এসবের মাত্র পনেরো শতাংশও অনুষ্ঠিত হয়নি। নিয়মিত তদারকির এই ঘাটতির কারণেই বহু ত্রুটি ধরা পড়েনি এবং কাজও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি।
গত জুনে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও এর একটি কাজও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো, প্রকল্পের মূল অবকাঠামো—মলবর্জ্য শোধনাগার—স্থাপনের কাজই এখনো শেষ হয়নি। একই সঙ্গে গণশৌচাগার, গৃহস্থালি স্যানিটেশন ও বাড়ি সংযোগের কাজও লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি, যার ফলে সামগ্রিকভাবে মানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি, ফলে এই অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখ্যা জানা সম্ভব হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা সরকারি বড় প্রকল্পের তদারকি ব্যবস্থায় বিদ্যমান দুর্বলতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ, যা ভবিষ্যতে জনস্বার্থমূলক প্রকল্পে জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কঠোর পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়।

