শতভাগ রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার আড়ালে বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৯২ হাজার টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে চট্টগ্রাম নগরের মেসার্স আর্টিস্টিক অ্যাপারেলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির গুদামে ১ লাখ ৪৭ হাজার ২০৯ কেজি কাঁচামালের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি; পাওয়া গেছে মাত্র ১৪ হাজার ৭৮৬ কেজি ফেব্রিক্স। গায়েব করা হয়েছে বন্ড রেজিস্টারও। নজিরবিহীন এই জালিয়াতির সত্যতা পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে ৮ কোটি ৭৭ লাখ ৯২ হাজার ১৪১ টাকা জরিমানা করেছে চট্টগ্রাম কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট।
নগরের নিউ চাক্তাই এলাকার একটি বাণিজ্যিক ভবনে পরিচালিত মেসার্স আর্টিস্টিক অ্যাপারেলস লিমিটেড শতভাগ রপ্তানিমুখী শিল্প হিসেবে বন্ড সুবিধায় কাপড় ও অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করে আসছিল। তবে এই সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠায় গত বছরের আগস্টে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের একটি বিশেষ দল কারখানা ও গুদাম পরিদর্শনে যায়। পরিদর্শনকালে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের গুদামে থাকার কথা ছিল লক্ষাধিক কেজি কাঁচামাল, কিন্তু বাস্তবে পাওয়া যায় মাত্র প্রায় ১৪ হাজার ৭৮৬ কেজি কাপড়। বাকি প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কেজি কাঁচামালের কোনো হদিস মেলেনি। এমনকি হিসাব রাখার জন্য নির্ধারিত বন্ড রেজিস্টারও গায়েব ছিল, যা এ ধরনের ঘটনায় বিরল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদন কার্যক্রম চালু থাকার কোনো বৈধ প্রমাণ দেখাতে না পারায় কর্তৃপক্ষ পরে প্রতিষ্ঠানের দুটি গুদাম সিলগালা করে দেয়। দীর্ঘ তদন্তে আমদানি-রপ্তানি সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি তথ্যভান্ডার ও ব্যাংকের রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সময়ে আমদানি করা বিপুল পরিমাণ কাপড়ের বিপরীতে কোনো রপ্তানির তথ্য নেই। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এই কাঁচামাল অবৈধভাবে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
এই হিসাবের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হলেও শুনানিতে মালিক বা তাদের কোনো প্রতিনিধি হাজির হননি। শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ফাঁকির সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধের নির্দেশের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থদণ্ড আরোপ করে মোট জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় প্রায় সাড়ে আট কোটি ৭৭ লাখ টাকা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করলে প্রতিষ্ঠানটির বন্ড লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
তবে জরিমানার সিদ্ধান্তের কয়েক মাস পর প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসে সিলগালা করা গুদাম খুলে দেওয়ার আবেদন করা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়েছে, নথিপত্রের জটিলতার কারণে গুদাম বন্ধ থাকায় উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু কাস্টমস ও বন্ড সংশ্লিষ্ট একটি অংশের অভিযোগ, জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করেই পুনরায় বন্ড সুবিধা ব্যবহারের চেষ্টা চলছে এবং এ জন্য বিভিন্ন মহলে তদবিরও করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট একজন ঊর্ধ্বতন কাস্টমস কর্মকর্তা বলেন, বন্ড সুবিধার আওতায় আনা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রি করে রাজস্বের ক্ষতি করার মতো ঘটনায় কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই এবং এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে থাকবে কর্তৃপক্ষ।
পোশাকশিল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি মনে করছেন, এত বড় পরিমাণ কাঁচামালের গরমিল দীর্ঘদিন ধরে কারও নজরে না আসাটা স্বাভাবিক নয়। তাদের ধারণা, এর পেছনে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, যারা পরিদর্শনের আগেই বিভিন্নভাবে তথ্য ফাঁস করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন, প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যে পরিমাণ কাঁচামাল খালাস করেছে, তার সম্পূর্ণ হিসাব দিতে ব্যর্থ হলে শুধু আগের মালিকের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে দায়মুক্তি পাওয়ার সুযোগ নেই।
আরেকজন পোশাকশিল্প নেতার মতে, বন্ড ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটতে থাকবে, যা সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা তৈরি করবে। তবে পোশাকশিল্পের একজন প্রতিনিধি কাস্টমসের এই অভিযোগকে কিছুটা অতিরঞ্জিত বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, প্রকৃত রপ্তানির পরিমাণ যাচাই না করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়, তবে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দোষী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনা উচিত, কারণ বন্ড সুবিধার এমন অপব্যবহার কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকও ফোন ও বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। তবে প্রতিষ্ঠানের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেছেন, রপ্তানি কার্যক্রম নিয়মিতভাবে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের তদারকির আওতায় থাকে এবং কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান জবাব দেবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
সব মিলিয়ে এই ঘটনা রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য দেওয়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার রোধে কার্যকর তদারকি ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

