‘পুরাতন যন্ত্রাংশ’ ঘোষণা দিয়ে জাপান থেকে আমদানি করা প্রায় বারো কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি ও তার যন্ত্রাংশ নিলাম প্রক্রিয়ার আড়ালে খালাসের একটি অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে বিশেষ অভিযান চালিয়ে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা বিলাসবহুল গাড়ির এসব যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়।
জব্দ করা যন্ত্রাংশের মধ্যে রয়েছে বিশ্বখ্যাত বিলাসবহুল গাড়ি ব্র্যান্ড লেক্সাস ও বিএমডব্লিউর একাধিক মডেলের বিভিন্ন অংশ, পাশাপাশি একটি জনপ্রিয় স্পোর্টস কার মডেলের ইঞ্জিন, সামনের কাঠামোগত অংশ এবং টায়ারসহ বিপুল পরিমাণ গাড়ির যন্ত্রাংশ।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জাপান থেকে আসা চালানটি প্রাথমিকভাবে ‘ব্যবহৃত স্পেয়ার পার্টস’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয়েছিল। তবে পণ্য বন্দরে পৌঁছানোর প্রায় এক মাস পার হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রয়োজনীয় শুল্ক-কাগজপত্র জমা দেননি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা যায়, এরপর নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চালানটি খালাসের একটি প্রচেষ্টা চলছিল।
গোপন সূত্রে তথ্য পেয়ে কাস্টমস গোয়েন্দার কর্মকর্তারা চালানটির ওপর নজরদারি শুরু করেন। পরবর্তীতে কনটেইনার খুলে সরেজমিন পরীক্ষা করা হলে ঘোষিত পণ্যের সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের ব্যাপক অসংগতি ধরা পড়ে—সাধারণ খুচরা যন্ত্রাংশের বদলে পাওয়া যায় বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত অংশ।
কাস্টমস গোয়েন্দাদের ভাষ্যমতে, উদ্ধার হওয়া যন্ত্রাংশের বিভিন্ন অংশে এমন কিছু নম্বর, চিহ্ন ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে, যা দিয়ে গাড়িগুলোর প্রকৃত পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চলছে। খণ্ডিত অবস্থায় আমদানি করা হলেও এসব যন্ত্রাংশে সম্পূর্ণ গাড়ির মূল বৈশিষ্ট্য বজায় আছে কিনা—তা বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় খতিয়ে দেখা হচ্ছে, যা শুল্ক শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, জব্দ হওয়া গাড়ির অংশবিশেষ ও অন্যান্য যন্ত্রাংশসহ পুরো চালানের সম্ভাব্য বাজারমূল্য সাড়ে নয় থেকে বারো কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।
চালানটির প্রকৃত আমদানি মূল্য, পরিশোধের ধরন, বাণিজ্যিক দলিলপত্র এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনও যাচাই-বাছাই করছে তদন্ত সংস্থা। একই সঙ্গে এই আমদানির সঙ্গে কোনো অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন বা অর্থ পাচারের সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, সে বিষয়টিও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
কাস্টমস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে চালানটির প্রকৃত পণ্য, প্রকৃত মূল্য এবং প্রযোজ্য শুল্ক-করের পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে। তদন্ত শেষে যদি রাজস্ব ফাঁকি বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ মেলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে কাস্টমস গোয়েন্দা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিলাম প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে মূল্যবান পণ্য স্বল্প শুল্কে খালাসের এই ধরনের প্রবণতা দেশের রাজস্ব আদায়ে একটি বড় ফাঁকফোকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ঘটনা তদন্তের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে একই কৌশলে অনিয়ম ঠেকাতে বন্দরে নজরদারি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

