চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে যে জাহাজে গ্যাস লিকেজের ঘটনায় নয়জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, সেই জাহাজের ভেতরে প্রাণঘাতী হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের অস্তিত্ব নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার পর জাহাজ ও তার আশপাশের এলাকা বিষমুক্ত করার কাজ যৌথভাবে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
শনিবার ইয়ার্ড পরিদর্শনকালে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দুর্ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পরও জাহাজের অভ্যন্তরে দশ পয়েন্ট আট পিপিএম মাত্রার হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে। তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার মুহূর্তে গ্যাসের ঘনত্ব একশ পিপিএমেরও বেশি ছিল, যার সংস্পর্শে আসার এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই আক্রান্ত শ্রমিকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
শনিবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান শিল্প মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা, সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন, শিপ ব্রেকার্স সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, জাহাজভাঙা একটি সম্ভাবনাময় শিল্প খাত, যাকে সরকার সব ধরনের সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা মেনে চলার পরও এমন দুর্ঘটনা সম্পূর্ণ অনাকাঙ্ক্ষিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
উল্লেখ্য, জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব রিসাইক্লিং নিশ্চিত করতে একটি আন্তর্জাতিক কনভেনশনের নির্দেশিকা অনুসরণ করা হয়, যার আওতায়ই এই ইয়ার্ডটি পরিচালিত হচ্ছিল।
দুর্ঘটনার পর থেকেই ইয়ার্ডটি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থার নজরদারিতে রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের একজন পরিদর্শক জানান, জাহাজ ও আশপাশের এলাকা থেকে বিষাক্ত গ্যাস সম্পূর্ণভাবে অপসারণে একটি যৌথ দল দ্রুত কাজ শুরু করবে।
দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ইতিমধ্যে একাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে এগারো সদস্যের একটি কমিটি এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একজন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে নয় সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এর আগে শিপ ব্রেকার্স ও রিসাইক্লার্স সংগঠনের পক্ষ থেকেও পাঁচ সদস্যের একটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই কমিটিগুলো দুর্ঘটনার বিস্তারিত কারণ চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেবে, আর তদন্তে শিপইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতির প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বাংলাদেশে ভাঙার জন্য আমদানি করা যেকোনো জাহাজকে ইয়ার্ডে প্রবেশের আগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থা থেকে গ্যাসমুক্তকরণ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুক্রবারের দুর্ঘটনায় জড়িত জাহাজটিরও এই সনদ ছিল বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
তবে সনদ থাকা সত্ত্বেও জাহাজের ভেতরে কীভাবে এত মারাত্মক মাত্রার বিষাক্ত গ্যাস থেকে গেল, তদন্তে সেই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হবে বলে তিনি জানান। এ ক্ষেত্রে কোনো অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে সনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থার বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রামের একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, নিহত শ্রমিকদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি। মামলা দায়ের হলেই প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি জানান। এ ছাড়া নিহত নয়জন শ্রমিকের মধ্যে আটজনের ময়নাতদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
এই দুর্ঘটনা দেশের জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে বৈধ গ্যাসমুক্তকরণ সনদ থাকা একটি জাহাজে কীভাবে এত মারাত্মক মাত্রার প্রাণঘাতী গ্যাস অবশিষ্ট থেকে গেল, তা নিয়ে গভীর সংশয় তৈরি হয়েছে। জাহাজটি ইয়ার্ডে প্রবেশের আগেই এতে বিষাক্ত গ্যাস ছিল কি না, নাকি শিপইয়ার্ড বা অন্য কোনো পক্ষ বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা প্রক্রিয়া পালনে ব্যর্থ হয়েছিল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন মনোযোগ দিয়েছেন তদন্তকারীরা।

