বিদেশে ব্যবহারের জন্য জন্মনিবন্ধন, বিবাহ সনদ কিংবা শিক্ষাগত সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি আইন অনুযায়ী সত্যায়িত ও অ্যাপোস্টিল করার পরও বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশন থেকে আবার সত্যায়নের বাধ্যবাধকতা কেন থাকবে—এ প্রশ্ন তুলেছেন হাইকোর্ট। এ ধরনের পুনঃসত্যায়নকে কেন বেআইনি ও কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।
একই সঙ্গে হেগ অ্যাপোস্টিল কনভেনশনের আলোকে বিদেশে থাকা বাংলাদেশের সব কনস্যুলার ও দূতাবাসের জন্য অভিন্ন নির্দেশনা ও নীতিমালা কেন করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) শুনানি শেষে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি এস এম ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল জারি করেন।
গত ২৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে জনস্বার্থে এ রিট আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নূরে আলম। রুলের জবাব দিতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং আইন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দুটি বিভাগের দুই সচিবকে চার সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।
রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো নথি অ্যাপোস্টিল করার পরও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিশনে গিয়ে সেটি আবার সত্যায়ন করাতে হচ্ছে। ফলে একটি নথির জন্য নাগরিকদের একাধিক সরকারি দপ্তর ও মিশনে ঘুরতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে বাড়তি প্রশাসনিক জটিলতা।
বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিক, শিক্ষার্থী, অসুস্থ ব্যক্তি, বয়স্ক নাগরিক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকা বাংলাদেশিরা এ ভোগান্তিতে বেশি পড়ছেন বলে রিটে তুলে ধরা হয়েছে। কোনো কোনো দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস বা কনস্যুলার কার্যালয় বাসস্থান থেকে কয়েক শ কিলোমিটার দূরে। ফলে শুধু নথি সত্যায়নের জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, যাতায়াত ও আবাসনের খরচ বহন, কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কুরিয়ারে পাঠানোর ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
এ ধরনের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ থেকে মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরিতে যোগদানসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ও পেশাগত সিদ্ধান্তেও।
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, আইন মন্ত্রণালয়ের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ এবং ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখের দুটি সার্কুলারে অ্যাপোস্টিল পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটেও এ বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি কনস্যুলার ও দূতাবাসে নথি সত্যায়নের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করায় নাগরিকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, কোনো নথির ক্ষেত্রে অ্যাপোস্টিলই যথেষ্ট, নাকি এর পরও দূতাবাসের সত্যায়ন প্রয়োজন—তা অনেক সময় আগে থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না। ফলে নাগরিকদের সংশ্লিষ্ট মিশনের ওয়েবসাইটের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু এসব তথ্য সব সময় নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ায় ভোগান্তি আরও বাড়ছে।
হাইকোর্টের এই রুল তাই শুধু একটি নথি সত্যায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে নয়; বিদেশে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য একই ধরনের নথি ব্যবস্থাপনায় অভিন্ন ও সহজ পদ্ধতি নিশ্চিত করার প্রশ্নও সামনে এনেছে। এখন রুলের জবাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যাখ্যা দেয়, তার ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটা নির্ভর করবে।

