দেশজুড়ে লাইসেন্সবিহীন ও নিয়মবহির্ভূতভাবে চলা হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে নেমেছে সরকার। গত পাঁচ মাসে সারা দেশে আড়াইশর বেশি অবৈধ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
চলতি বছরের ২৯ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই অভিযান এখনও নিয়মিতভাবে চলছে। বেশ কয়েকটি অভিযানে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী নিজেও, যা স্বাস্থ্য খাতে সরকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার প্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, আর প্রায় ২০০টি প্রতিষ্ঠানকে ত্রুটি সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাদেরও নবায়নের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলাফল হিসেবে ইতোমধ্যে প্রায় ছয় হাজার প্রতিষ্ঠান তাদের লাইসেন্স নবায়ন করেছে, আর নতুন করে দুই থেকে তিন হাজার আবেদন জমা পড়েছে, যেগুলো যাচাই-বাছাই শেষে অনুমোদন দেওয়া হবে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য স্বাস্থ্য খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, জনগণের আস্থা বৃদ্ধি এবং নিরাপদ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে লাইসেন্সবিহীন কার্যক্রম, নানা অনিয়ম ও নিম্নমানের সেবা দেওয়ার অভিযোগ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই মূলত টার্গেট করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশজুড়ে মোট এক হাজার ২৮৫টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি প্রতিষ্ঠান ছিল ঢাকা বিভাগে। এরপর ময়মনসিংহে ২৫২টি, চট্টগ্রামে ২৪০টি, খুলনায় ১৫৬টি, রংপুরে ১১১টি, রাজশাহীতে ৫৫টি, বরিশালে ৪৮টি এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৮টি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে চলছিল। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয়, বরং সারা দেশেই কমবেশি বিদ্যমান।
গত কয়েক মাসে রাজধানীতেই প্রায় ২৫টি অবৈধ প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। পরিদর্শনকালে অনেক প্রতিষ্ঠানে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ায় জরিমানা, কার্যক্রম বন্ধ কিংবা কারণ দর্শানোর নোটিশের মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর বাইরেও এই অভিযান বিস্তৃত হয়েছে ফরিদপুর, টাঙ্গাইল, শরীয়তপুর, নরসিংদী, পাবনা, মানিকগঞ্জ, ঝিনাইদহ ও রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলায়। সব মিলিয়ে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ব্লাড ব্যাংক বন্ধ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ন্যূনতম মানদণ্ড রক্ষায় ব্যর্থ হলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে এবং এক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। রাজধানী থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম ধীরে ধীরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জানান, অভিযানের অংশ হিসেবে লাইসেন্স যাচাই, চিকিৎসা সরঞ্জামের মানপরীক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং চিকিৎসকদের সনদ যাচাইয়ের মতো একাধিক ধাপ অনুসরণ করা হচ্ছে। অনিয়ম পাওয়া গেলে সঙ্গে সঙ্গে জরিমানা, সিলগালা কিংবা কার্যক্রম বন্ধের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভুয়া চিকিৎসক, নার্স ও মেডিকেল টেকনিশিয়ানদের বিরুদ্ধেও পৃথকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ধারাবাহিক অভিযান স্বাস্থ্য খাতে স্বল্পমেয়াদে শৃঙ্খলা ফেরাতে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ফল পেতে হলে লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়া ও নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। অন্যথায় অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও একই ধরনের অনিয়ম মাথাচাড়া দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যায় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

