সন্তানের ভরণপোষণের তাগিদে গৃহকর্মীর কাজ খুঁজতে ছয় মাস আগে বাগেরহাট থেকে ঢাকায় এসেছিলেন উনিশ বছর বয়সী এক তরুণী। কিন্তু কাজের প্রতিশ্রুতির আড়ালে তাকে ফেলা হয় এক ভয়াবহ ফাঁদে— জোরপূর্বক মাদক সেবন করিয়ে, সেই মাদক সেবনের ভিডিও দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে এক চীনা নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে দিয়ে তাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চীনে, যেখানে দীর্ঘদিন তাকে সহ্য করতে হয় শারীরিক ও যৌন নির্যাতন।
মানবপাচারবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় গত ৪ আগস্ট অবশেষে দেশে ফিরে আসেন তিনি। এই ছদ্মনামধারী ভুক্তভোগীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরছে বাংলাদেশি নারীদের বিয়ের নামে চীনে পাচারের একটি ভয়ঙ্কর চিত্র।
স্বল্পশিক্ষিত এই তরুণী আগে একটি পাটকলে কাজ করতেন। তার দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় রাজধানীর বারিধারায় গৃহকর্মীর কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তবে বাস্তবে তাকে রাখা হয় উত্তর বাড্ডার একটি ফ্ল্যাটে। এর কিছুদিন পরই তাকে জোরপূর্বক মাদক সেবন করানো শুরু হয় বলে অভিযোগ তার। ধীরে ধীরে মাদকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন তিনি, আর সেই নির্ভরতাকেই নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার বানায় পাচারকারীরা।
তরুণীর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে বোঝানো হয়েছিল যে মাদক সেবন করলে সন্তানের কথা ভুলে যাবেন এবং কান্নাকাটিও করবেন না। এরপর সেই মাদক সেবনের ভিডিওকে হাতিয়ার বানিয়ে তাকে বাধ্য করা হয় এক চীনা নাগরিককে বিয়ে করতে।
স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে রাজধানীর একটি শপিং মলে ওই চীনা নাগরিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় তরুণীকে। এরপর তার পাসপোর্ট তৈরি, চীনা দূতাবাসে যাওয়া এবং একটি কফি শপে বিভিন্ন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করানোর মতো ধাপগুলো দ্রুতই সম্পন্ন করা হয়। প্রায় এক মাস পর তাকে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে চীনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে ইউনিফর্ম পরিহিত এক ব্যক্তি তাকে ও আরেক বাংলাদেশি নারীকে উড়োজাহাজে তুলে দেন বলে জানান তিনি, যদিও ওই ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
চীনে পৌঁছানোর পর প্রথম কয়েকদিন হোটেলে রাখার পর তাকে নেওয়া হয় স্বামীর পরিবারের বাড়িতে। শুরুর দিকে আচরণ স্বাভাবিক থাকলেও ভিসার মেয়াদ বাড়ানোর পরই শুরু হয় নির্যাতন। তার অভিযোগ, একরাতে হাত-পা বেঁধে অন্ধকারে অন্য একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে, যেখানে প্রায় বিশ দিন আটকে রেখে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। মাঝে কিছুদিনের বিরতি দিয়ে আবারও একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হন তিনি। দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইলে তার ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়।
পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার ভান করে কৌশলে একটি ফোন জোগাড় করেন তিনি। এক পর্যায়ে স্বামীর ফোনের বার্তা থেকে জানতে পারেন, তাকে বিয়ে করানোর বিনিময়ে দালালকে মোটা অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছিল, আবার তাকে দেশে ফেরত পাঠানোর নামে তার পরিবারের কাছেও অর্থ দাবি করা হয়েছিল।
একদিন চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার সময় সুযোগ বুঝে পালিয়ে একটি রেস্তোরাঁয় আশ্রয় নেন তিনি। সেখানে কর্মীদের নিজের আঘাতের ছবি ও হুমকির অনুবাদ দেখানোর পর তারা জরুরি সেবায় খবর দেন। স্থানীয় পুলিশ তার পাসপোর্ট উদ্ধার করে তাকে বেইজিংয়ের টিকিট কিনে দেয়। ভাষাগত জটিলতার কারণে সেখানে সহায়তা পেতে বেগ পেতে হলেও শেষমেশ একটি মানবপাচারবিরোধী সংস্থার সহায়তায় দেশে ফেরার ব্যবস্থা হয় তার।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের মানবপাচার ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমানে চীনকেন্দ্রিক অন্তত চারটি মানবপাচার মামলা তদন্তাধীন রয়েছে তার হাতে। এছাড়া রাজধানীর একাধিক থানায় একই ধরনের বেশ কিছু মামলা দায়ের হয়েছে। তিনি জানান, চীনা দূতাবাসের তথ্যমতে গত বছর চীনের জন্য এক হাজারের বেশি ফ্যামিলি ভিসা ইস্যু হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ছয়শ জন ইতিমধ্যে সে দেশে চলে গেছেন বলে ধারণা তাদের। তিনি স্বীকার করেন, বৈধ বিয়ে ও ভিসার কাগজপত্র থাকলে কাউকে যাত্রা থেকে বিরত রাখা কঠিন, আর অনেক ভুক্তভোগী বিদেশ যাওয়ার আগ পর্যন্ত ঝুঁকির বিষয়টি বুঝতেই পারেন না।
একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার অভিবাসনবিষয়ক এক কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও গত দেড় বছরে এমন ঘটনার খবর অনেক বেড়েছে। তার পরামর্শ, বিয়ে করতে ইচ্ছুক চীনা নাগরিকদের পরিচয় ও বৈবাহিক অবস্থা যথাযথভাবে যাচাই করা এবং কতজন নারী চীনে গিয়েছেন বা ফেরত আসেননি, তাদের ব্যাপারে ইমিগ্রেশন ও পুলিশের সক্রিয় খোঁজখবর রাখা জরুরি।
তরুণীর মা গত ২ আগস্ট খুলনার একটি মানবপাচার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে বাংলাদেশি দালালসহ মোট সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় প্রতারণা, জোরপূর্বক মাদক সেবন, যৌন নিপীড়ন, জোরপূর্বক বিয়ে এবং মানবপাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর বিবরণ ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনা চলছে, তবে তার মোবাইল ফোন এখনও চীনে থেকে যাওয়ায় কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এ পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত দেড় বছরে বিদেশে বিয়ের নামে প্রতারণার অভিযোগে অন্তত ছয়জন চীনা নাগরিককে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত জুলাইয়ে এক বিবৃতিতে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাস নিজ দেশের নাগরিকদের বাংলাদেশে অবৈধ ঘটকদের বিষয়ে সতর্ক করে জানায়, এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে পাচার, চাঁদাবাজি, হুমকি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভুক্তভোগীকে সহায়তাকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, এই তরুণীর ফিরে আসার ঘটনা প্রমাণ করে এ ধরনের অপরাধ দমনে দ্রুত আন্তসীমান্ত সহযোগিতা, গুরুত্বসহকারে তদন্ত এবং ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সচেতন করার প্রয়োজনীয়তা কতটা জরুরি।
চীনা দূতাবাসের একজন কূটনীতিক জানান, ফ্যামিলি ভিসার আবেদনকারীদের বিয়ে সত্যিকারের কি না এবং তারা স্বেচ্ছায় ভ্রমণ করছেন কি না তা যাচাইয়ে বিয়ের সনদের সত্যতা পরীক্ষা ও সরাসরি সাক্ষাৎকারসহ একাধিক ধাপ অনুসরণ করা হয়। তবে তিনি জানান, মানবপাচারের বেশিরভাগ অভিযোগ সরকারি সংস্থার চেয়ে গণমাধ্যম থেকেই বেশি পাওয়া যায়। পাচারে চীনা কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, দুই দেশের ম্যারেজ ব্রোকাররাই এসব সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের মূল হোতা এবং এটি তাদের কাছে একটি লাভজনক ব্যবসা। তিনি বাংলাদেশ পুলিশকে এসব দালালের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান এবং জানান, বাংলাদেশে দূতাবাসের কোনো আইন প্রয়োগের এখতিয়ার না থাকায় তদন্ত-গ্রেপ্তারের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের ওপরই নির্ভর করতে হয় তাদের। মানবপাচারের বিরুদ্ধে চীনের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর এবং এ ধরনের অপরাধে জড়িত নিজ দেশের নাগরিকদের প্রতি শূন্য সহনশীলতা নীতি রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

