করোনার সময় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ বসিয়ে না রেখে কার্গো পরিবহনে নামিয়েছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। উদ্দেশ্য ছিল একদিকে আয় ধরে রাখা, অন্যদিকে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার জরুরি চাহিদা কাজে লাগানো। কিন্তু অভ্যন্তরীণ তদন্তে এখন যে চিত্র সামনে এসেছে, তাতে সেই উদ্যোগই উল্টো বড় আর্থিক ক্ষতির প্রশ্ন তুলেছে। দ্য ডেইলি স্টারের হাতে আসা বিমানের অভ্যন্তরীণ তদন্ত নথি অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২২ সালের বিভিন্ন নন-শিডিউলড ও চার্টার্ড কার্গো ফ্লাইটে প্রায় ৮৮৬ কোটি টাকা সমপরিমাণ রাজস্ব সংগ্রহ, হিসাব ও বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি পাওয়া গেছে।
করোনার সময় আন্তর্জাতিক যাত্রী চলাচল প্রায় থেমে গেলে বিমানও সংকটে পড়ে। বিমান নিজস্ব এক প্রকাশনায় জানিয়েছিল, মহামারির সময় যাত্রী পরিবহন বন্ধ বা সীমিত থাকায় তারা বিশেষ ও চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে এবং একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ডেডিকেটেড কার্গো ফ্লাইটও চালায়। ২০২০ সালের মে মাসে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ব্যবহার করে কার্গো পরিবহনের জন্য বিমানকে সাময়িক অনুমতিও দিয়েছিল বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। অর্থাৎ সেই সময় কার্গো ব্যবসায় যাওয়া ছিল অস্বাভাবিক কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বজুড়েই এয়ারলাইনগুলো আয় ধরে রাখার জন্য এমন পথ বেছে নিয়েছিল। সমস্যা তৈরি হয়েছে মূলত সেই ব্যবসার টাকা কতটা সঠিকভাবে সংগ্রহ ও হিসাব করা হয়েছিল, তা নিয়ে।
একই ফ্লাইটের দুই চুক্তি, কিন্তু টাকার অঙ্ক আলাদা
অভ্যন্তরীণ তদন্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে চীনের গুয়াংজু রুটকে ঘিরে। ২০২৫ সালের ১৯ মে তারিখের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে একই ধরনের ফ্লাইটের জন্য দুটি আলাদা চুক্তির কথা উঠে এসেছে। নথি অনুযায়ী, বিমানের কাছে থাকা চুক্তিতে প্রতি ফ্লাইটের চার্টার মূল্য ছিল ৭৬ হাজার ডলার। কিন্তু সংশ্লিষ্ট চীনা প্রতিষ্ঠান সুপারপাওয়ার লজিস্টিকসের কাছে থাকা আরেক চুক্তিতে একই ফ্লাইটের মূল্য দেখানো হয় ৩ লাখ ডলার। ২০২১ সালের ১৩ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে পরিচালিত নয়টি ফ্লাইটের ক্ষেত্রে এই দুই চুক্তির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তদন্তকারীরা এটিকে বড় ধরনের রাজস্ব ফাঁসের আলামত হিসেবে দেখেছেন। তবে এই অভিযোগের চূড়ান্ত দায় কার ওপর বর্তায়, সেটি তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্তের বিষয়।
আরও অস্বস্তিকর বিষয় হলো, বিমানের নিজস্ব ৭৬ হাজার ডলারের চুক্তি ধরেও সব টাকা আদায় হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনের হিসাবে, গুয়াংজু রুটে বিমান প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার সংগ্রহের তথ্য পেয়েছে। অথচ তাদের কাছে থাকা চুক্তির হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১ কোটি ৬৪ লাখ ডলার পাওয়ার কথা ছিল। অর্থাৎ বিমানের নিজস্ব চুক্তির হিসাবেও প্রায় ৩৩ লাখ ডলারের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। আর যদি ৩ লাখ ডলারের চুক্তিটিই প্রকৃত চুক্তিমূল্য হয়ে থাকে, তাহলে সম্ভাব্য ব্যবধান আরও অনেক বড়। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, লেনদেনের কয়েক বছর পেরিয়ে যাওয়ায় সব পেমেন্ট রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে যথাযথ ইনভয়েসও দেওয়া হয়নি।
২৩০ ফ্লাইটের মধ্যে হিসাব মিলেছে মাত্র ৩৩টির
সমস্যাটি শুধু একটি রুট বা একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০২৪ সালের নভেম্বরে জমা দেওয়া আরেকটি অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা-হংকং রুটে বিমান ২৩০টি নন-শিডিউলড কার্গো ফ্লাইট পরিচালনা করলেও রাজস্বের রেকর্ড পাওয়া গেছে মাত্র ৩৩টির। ওই রেকর্ডে প্রায় ৩১ লাখ ২০ হাজার ডলারের আয় দেখা গেলেও প্রতি ফ্লাইটের গড় আয় ধরে তদন্তকারীরা অনুমান করেছেন, মোট আয় ২ কোটি ১৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি হওয়ার কথা। অর্থাৎ এখানে প্রশ্ন শুধু টাকা আদায় হয়েছে কি না তার আগে প্রশ্ন হচ্ছে, কতগুলো ফ্লাইট থেকে কত আয় হওয়ার কথা ছিল, সেই মৌলিক হিসাবই কেন পুরোপুরি পাওয়া গেল না।
চীনগামী ফ্লাইটেও একই ধরনের অসঙ্গতি ধরা পড়ে। ঢাকা-গুয়াংজু ও ঢাকা-উহান রুটে মোট ২১২টি ফ্লাইট পরিচালনার তথ্য থাকলেও তদন্তকারীরা রেকর্ড পেয়েছেন মাত্র ৯০টির। পাওয়া নথিতে প্রায় ৮৩৫ লাখ ডলারের রাজস্বের হিসাব থাকলেও তদন্তের হিসাবে প্রকৃত আয় এর দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে বিমান নিজেই যে চার্টার সেল তৈরি করেছিল, সেটিও প্রত্যাশিতভাবে রাজস্বের হিসাব রাখতে পারেনি বলে তদন্তে উঠে এসেছে। অর্থাৎ এখানে সমস্যা কোনো একটি ভুল ইনভয়েসের নয়; বরং চুক্তি, ফ্লাইট অপারেশন, রাজস্ব হিসাব এবং অর্থ সংগ্রহ পুরো ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির ইঙ্গিত মিলছে।
ব্যাংককের রুটেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ৮৫টি চার্টার্ড ফ্লাইটের ফ্লাইট রেকর্ড ও রাজস্ব বিবরণীর মধ্যে অসঙ্গতি খুঁজে পান তদন্তকারীরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ফ্লাইট থেকে আয় হওয়া প্রায় ৭ কোটি ১৮ লাখ টাকা বিমানের হিসাব থেকে বাদ পড়ে বা অনাদায়ী থেকে যায়। এমনকি ২০টি ফ্লাইটের চুক্তিও তদন্তকারীরা খুঁজে পাননি। ফলে সেসব ফ্লাইট থেকে কত আয় হওয়ার কথা ছিল, সেটিও নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ছাড়ের নামে কতটা টাকা ছেড়ে দিয়েছিল বিমান?
শুধু টাকা আদায় না করার অভিযোগ নয়, কিছু ক্ষেত্রে চুক্তি অনুযায়ী পাওনা অর্থ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ও সামনে এসেছে। গুয়াংজু রুটে ১৫২টি ফ্লাইট বাতিল হলেও চুক্তিতে নির্ধারিত বাতিল ফি ও গ্রাউন্ড-টাইম পেনাল্টির পুরোটা আদায় করা হয়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। সাতটি বাতিল ফ্লাইটের ক্ষেত্রেই বিমানের পাওনা ছিল ৩ লাখ ৭১ হাজার ২০০ ডলার বাতিল ফি এবং আরও ১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার গ্রাউন্ড-টাইম পেনাল্টি। কিন্তু এর প্রায় পুরোটা মওকুফ করে মাত্র ১৮ হাজার ৫৬০ ডলার নেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরে করোনাজনিত বিধিনিষেধ, লকডাউন ও ছুটির মতো পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছিলেন। তবে তদন্তে চুক্তির নির্ধারিত শর্তও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফ্লাইট বাতিল হলে চুক্তিমূল্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে রাখার বিধান ছিল।
আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। চীনা সরকারের মহামারি-কালীন কার্গো প্রণোদনা থেকেও বিমান অর্থ পেয়েছিল কি না, তার প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি। তদন্ত প্রতিবেদনের হিসাবে, উহান ও গুয়াংজু রুটের ২১২টি ফ্লাইটের জন্য দূরত্ব ও উড়োজাহাজের সর্বোচ্চ উড্ডয়ন ওজনের ভিত্তিতে বিমানের প্রায় ৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রণোদনা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই অর্থ দাবি বা গ্রহণের কোনো প্রমাণ তদন্তকারীদের হাতে আসেনি। অর্থাৎ বিমান যে সময় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের জন্য কার্গো ব্যবসায় নেমেছিল, সেই সময় সম্ভাব্য আয়ের একটি অংশ কোথায় গেল সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
ক্ষতি শুধু রাজস্বে নয়, উড়োজাহাজেও
কার্গো পরিবহনের সেই সিদ্ধান্তের আরেকটি আর্থিক প্রভাব পড়ে বিমানের নিজস্ব উড়োজাহাজে। অভ্যন্তরীণ অডিট ও অর্থবিষয়ক কমিটির নথি অনুযায়ী, করোনার সময় চারটি বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজের ইন-ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট বা আইএফই সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নথিতে বলা হয়েছে, যাত্রী আসনের ওপর সরাসরি কার্গো পরিবহনের কারণে এই ক্ষতি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ১৬০টি সিট মেরামতে যুক্তরাষ্ট্রের থ্যালেস অ্যাভিওনিকসকে প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৮২৪ ডলার দেওয়া হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে কার্গো থেকে আয় করার উদ্যোগের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের একটি নতুন চাপও যুক্ত হয়।
তবে পুরো ঘটনাটিকে শুধু ‘বিমানের লোকসান’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি বাদ পড়ে যাবে। জাতীয় পতাকাবাহী একটি এয়ারলাইনের জন্য সংকটের সময়ে নতুন ব্যবসার সুযোগ খোঁজা প্রয়োজনীয় হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবসা লাভজনক করার প্রথম শর্ত হলো প্রতিটি ফ্লাইটের চুক্তিমূল্য, ইনভয়েস, পেমেন্ট, জরিমানা, প্রণোদনা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হিসাব একই জায়গায় স্বচ্ছভাবে থাকা। বিমান ২০২৪ সালে নন-শিডিউলড ও চার্টার্ড ফ্লাইটের লাভজনকতা বিশ্লেষণের জন্য আলাদা ফ্লাইট প্রফিটেবিলিটি ও বাজেটিং সিস্টেম তৈরির পরামর্শ চেয়েছিল যা দেখায়, এই অংশে আরও শক্তিশালী হিসাব ও নজরদারির প্রয়োজনীয়তা প্রতিষ্ঠানটির কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিমানের বর্তমান ব্যবস্থাপনা জানিয়েছে, করোনাকালের চার্টার্ড ফ্লাইট নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্ত চলছে এবং তদন্তের ফলাফলের অপেক্ষা করা হচ্ছে। তাই ৮৮৬ কোটি টাকা ‘চুরি হয়েছে’ বা পুরো অর্থ নির্দিষ্ট কারও মাধ্যমে আত্মসাৎ হয়েছে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে তদন্তের পূর্ণ ফল এবং দায় নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়া জরুরি। তবে নথিতে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো ইতোমধ্যে একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: একটি জাতীয় এয়ারলাইন যখন সংকটের সময় নতুন আয়ের পথ খুঁজল, তখন সেই আয়ের হিসাব রাখার ব্যবস্থাই যদি দুর্বল থাকে, তাহলে ব্যবসার সুযোগ শেষ পর্যন্ত কীভাবে আর্থিক ঝুঁকিতে পরিণত হয়? বিমানের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুধু হারানো টাকা উদ্ধারের চেষ্টা নয়; ভবিষ্যতে প্রতিটি চার্টার চুক্তি, রাজস্ব সংগ্রহ ও বৈদেশিক লেনদেনে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একই ধরনের প্রশ্ন আর না ওঠে।

