বৃহস্পতিবার রাতের পর থেকে বন্ধ ছিল সব ফোন। বোনের ফোন, জামাইবাবুর ফোন, ভাগনির ফোন কাউকেই পাওয়া যাচ্ছিল না। শনিবার রাতে আর থাকতে না পেরে বোন পূজা চক্রবর্তী ছুটে আসেন রংপুরের মাছুয়াপাড়ায়। সামনে তিনতলা বাড়ি, কিন্তু দরজা ছিল তালাবদ্ধ। খোলা হলো দরজা। ভেতর থেকে ভেসে এলো পচা গন্ধ। আর তারপরই একে একে উদ্ধার করা হলো চারটি লাশ।
এখন সেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে এগোচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার (২৩ আগস্ট) ভোর পর্যন্ত মাছুয়াপাড়া এলাকার দুই যুবককে আটক করা হয়েছে। তাদের নাম সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। দুজনের বাড়ি ওই মাছুয়াপাড়া এলাকায়। পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর ভবনটিতে বসে তারা ইয়াবা সেবন করেছিল বলেও আলামত পাওয়া গেছে।
মৃত চারজন হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৮) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১৪)। গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর রংপুর সমবায় মার্কেটে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। মেয়ে আগামী চলতি বছর রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। আর ছেলে আয়ুশ ছিল রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
লাশগুলোর অবস্থান নারদের মনে কাঁপুনি দিয়েছে। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া গেছে বাড়ির ছাদে। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে তৃতীয় তলার সিঁড়ি থেকে। আর ছোট ছেলে আয়ুশের লাশ পাওয়া গেছে দ্বিতীয় তলার বিছানার নিচে। বাসার ভেতর জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র ছিল এলোমেলো।
পরিবারের সঙ্গে স্বজনদের শেষ কথা হয়েছিল বৃহস্পতিবার রাতে। ওইদিন রাত থেকে পরিবারের চারটি মোবাইল ফোনই বন্ধ পাওয়া যায়। শনিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে পচা গন্ধ পেয়ে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়। খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তালা ভেঙে মরদেহগুলো উদ্ধার করে।
রংপুর সিআইডির ইনচার্জ সুমিত চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ডাকাতির উদ্দেশ্যেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। বাসার বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। টাকাপয়সা যেখানে থাকে, সবকিছু ভেঙে ফেলা হয়েছে। গলায় রশি বা গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত চলছে।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় যুবকদের একটি দল এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তারা ডাকাতির উদ্দেশ্যেই ওই বাড়িতে ঢুকে নৃশংস এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আটকদের মধ্যে একজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুঁতবাগানে লুকিয়ে পড়েন। পরে তুঁতবাগানের পাশেই দখীগঞ্জ শ্মশান থেকে তাকে আটক করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট আলামত সংগ্রহ করেছে। মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগ, র্যাবসহ একাধিক সংস্থা তদন্ত করছে। লাশগুলো ময়নাতদন্তের জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপকমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। তবে বাড়িঘর যেভাবে তছনছ করা হয়েছে, তাতে টাকা-পয়সা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।
সাবেক শিক্ষক ও তাঁর পরিবারের এই মর্মান্তিক মৃত্যু এলাকায় শোকের ছায়া ফেলেছে। ছাদ থেকে বিছানার নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা চারটি লাশের ঘটনা এখনও রহস্যঘেরা। পুলিশ জানিয়েছে, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

