বাংলাদেশ রেলওয়ের যাত্রীসেবার মান বাড়াতে হাতে নেওয়া ‘দুইশ ব্রডগেজ যাত্রীবাহী বগি সংগ্রহ’ প্রকল্পে ব্যয়ের হিসাবে এমন অসংগতি ধরা পড়েছে, যা রীতিমতো উদ্বেগজনক। প্রকল্প দলিলে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় এতটাই বেশি যে বিশেষজ্ঞরা একে সরাসরি আত্মসাতের সুযোগ তৈরির কৌশল বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পে প্রায় এক হাজার একশ ঊনিশ কোটি একত্রিশ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা স্বাভাবিক ব্যয়ের তুলনায় শতগুণ বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতির দিকে তাকালে চিত্রটি আরও হতাশাজনক। নির্ধারিত মেয়াদের অর্ধেকেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখনো একটি বগিও দেশে এসে পৌঁছায়নি। অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি পরিদর্শন, প্রকৌশলী নিয়োগসহ নানা খাতে ইতিমধ্যেই বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা বিশেষজ্ঞদের চোখে স্পষ্টতই অর্থ আত্মসাতের একটি রূপ।
প্রকল্পের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ব্যাংক-সংক্রান্ত ব্যয়ের খাতটি কোনো দরপত্র ছাড়াই রাখা হয়েছে। এই খাতের বিপরীতে কোনো সম্পদ পরিদর্শনের সুযোগ নেই এবং ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে স্থানীয় মুদ্রায় অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, মূল যন্ত্রপাতি সরবরাহের চুক্তি সইয়ের আগেই প্রথম দুই বছরে মোট বরাদ্দের সত্তর শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় আটশ ঊনত্রিশ কোটি বারো লাখ টাকা ছাড় করার সংস্থান রাখা হয়েছে, যার সঙ্গে অন্য কোনো হিসাবের মিল পাওয়া যায়নি।
আর্থিক নথি বিশ্লেষণে অন্তত ছয়টি সুনির্দিষ্ট অসংগতি চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলোকে বিশেষজ্ঞরা নিছক অনিয়ম নয় বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পর্যায়ে ফেলছেন। গত চব্বিশে জুন করা এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিভিন্ন খাতে প্রায় একই ধরনের ব্যয় হুবহু বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক আর্থিক বিশ্লেষক জানান, নির্দিষ্ট কোনো কাজের বরাদ্দ ছাড়াই একজন পরামর্শকের আটচল্লিশ মাসের সম্মানি ধরা হয়েছে সাত কোটি পঁচিশ লাখ টাকা। তাঁর ভাষ্যে, অন্যান্য পরামর্শকের ফি হিসাবের ঘরগুলোও একই ছাঁচে বসানো, এমনকি ক্রেন ও লেদ মেশিনের পরামর্শক ফি দশমিকের পর ছয় ঘর পর্যন্ত অবিকল মিলে যায়—যা থেকে স্পষ্ট, এসব সংখ্যা একটি রেলপথ নির্মাণ চুক্তি থেকে হুবহু তুলে আনা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় একশ ছত্রিশ কোটি সাতান্ন লাখ টাকা ব্যয়ে একটি চতুর্থ রিলিফ ক্রেন যুক্ত করা হয়েছে, যা মূল প্রকল্প-কাঠামোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট হিসাব-নথিতে দুইশ একুশটি ভুল চিহ্নিত হয়েছে, যার মধ্যে ক্রয় পরিকল্পনার সামগ্রিক হিসাব এবং প্রধান তিনটি প্যাকেজের ব্যয়-সংক্রান্ত তথ্য সরকারি ক্রয়বিধির শর্ত লঙ্ঘন করে ফাঁকা রাখা হয়েছে।
নথিতে আরও দেখা যায়, চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানাসহ পার্বতীপুর এবং ঈশ্বরদীতে কমিশনিং ও প্রক্রিয়াকরণ বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় চার লাখ নব্বই হাজার পনেরো কোটি সাতাশ লাখ টাকা। বগি এসে পৌঁছানোর আগেই প্রকল্প কার্যালয়ের জন্য কম্পিউটার, আসবাবপত্র ও প্রিন্টার কিনতে ব্যয় করা হয়েছে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা।
জানা গেছে, প্রকল্পটির মূল মেয়াদ ধরা হয়েছিল দুই হাজার বাইশ সালের জুলাই থেকে দুই হাজার সাতাশ সালের জুন পর্যন্ত। ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় এক হাজার ছয়শ ছাব্বিশ কোটি টাকা ব্যয় ধরে যাত্রীসেবার মান বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদনের বহু বছর পরও কার্যক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি চোখে পড়েনি। দুই হাজার চব্বিশ সালের মে মাসে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান আরআইটিইএসের সঙ্গে বগি সরবরাহের চুক্তি হলেও তার সুফল যাত্রীদের কাছে এখনো পৌঁছায়নি।
আরও জানা গেছে, দুইশ মিটারগেজ যাত্রীবাহী বগি সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট কমিশনিং, প্রশিক্ষণ, পরিদর্শনসহ নানা খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ ঊনআশি হাজার তিনশ নয় কোটি পঁচানব্বই লাখ টাকা। বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন নির্মাণ ও চারটি হুইল লেদ মেশিনের বিদ্যুতায়নের জন্য ধরা হয়েছে ছয়শ কোটি টাকা। এমজি বগির নকশা যাচাই, প্রোটোটাইপ চূড়ান্তকরণসহ পরামর্শক নিয়োগ বাবদ খরচ দেখানো হয়েছে দুই হাজার চৌদ্দ কোটি বাইশ লাখ টাকা, আর রিলিফ ক্রেন সংক্রান্ত পরামর্শক নিয়োগে ব্যয় ধরা হয়েছে নয়শ এক কোটি বিশ লাখ টাকা। এসবের বাইরে একটি জিপ, একটি মাইক্রোবাস ও একটি সেডান গাড়ি ভাড়া বাবদ কর ও ভ্যাটসহ খরচ দেখানো হয়েছে তিনশ কোটি টাকা।
কার্যালয়ের আসবাবপত্র ও অফিস সরঞ্জাম কিনতে পঁয়ত্রিশ লাখ টাকা ব্যয়ের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষ ও বিশেষজ্ঞ মহলে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। এই ‘বিলাসী কেনাকাটা’ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, ভারতের পাঞ্জাবের একটি রেল কোচ কারখানা থেকে তৈরি উনিশটি আধুনিক ব্রডগেজ কোচের প্রথম চালান চলতি মাসে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন রেলের একাধিক কর্মকর্তা। দুই হাজার চব্বিশ সালে সই হওয়া দুইশ কোচ আমদানির চুক্তির আওতায় এটিই প্রথম চালান। কোচগুলো আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী দুর্ঘটনা প্রতিরোধী প্রযুক্তিসম্পন্ন এবং অতিরিক্ত যাত্রীচাপ সামলাতে সক্ষম মজবুত কাঠামোয় তৈরি বলে জানা গেছে।
তবে রেল বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কেনাকাটায় এমন অনিয়ম অব্যাহত থাকলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য—যাত্রী সংকট নিরসন—কখনোই পূরণ হবে না। প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি অতিরিক্ত ব্যয় সম্পর্কে কোনো তথ্য দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং নিজেকে এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ব্যক্তি নন বলে উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের এক অধ্যাপক মন্তব্য করেন, এ ধরনের অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর। তিনি বলেন, রেল কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজেরাই অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অতীতে বড় ধরনের ক্রয়-দুর্নীতি হজম করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিদেশ ভ্রমণে পাঠানোর নজিরও রয়েছে। তাঁর প্রশ্ন, মন্ত্রণালয় নিজে অনুসন্ধানে ব্যর্থ হলে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি কেন সক্রিয় করা হচ্ছে না—যেখানে জনপ্রতিনিধিরা প্রকৃত অর্থে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারেন দায়িত্বশীলদের।
তিনি আরও বলেন, রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সেবার মান, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছে। বিশ্বের অন্যত্র রেলকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব বাহন হিসেবে দেখা হলেও দেশের প্রেক্ষাপটে তা এখনো প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না, বরং ক্রমেই আর্থিক বোঝায় পরিণত হচ্ছে। তাঁর মতে, জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের অনিয়মের আশঙ্কা থেকেই যাবে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, প্রকল্পে দেখানো অস্বাভাবিক ব্যয়ের পেছনের কারণ খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে সরকারি অর্থের অপচয় রোধ করে যাত্রীসেবা নিশ্চিতের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।

