রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার আওতাধীন পাঁচ জেলায় রেললাইনে কাটা পড়ে মানুষ মারা যাওয়ার ঘটনা যেন থামছেই না। সম্প্রতি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে দুই তরুণের রেলে কাটা পড়ে মৃত্যুর পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম সাড়ে সাত মাসে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর মিলিয়ে অন্তত চল্লিশজন মানুষ এভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।
রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার (জিআরপি) হিসাব বলছে, রেলপথের একশোরও বেশি জায়গা এখনো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। অনেক লেভেল ক্রসিংয়ে নেই কোনো গেটম্যান, নেই প্রতিবন্ধক বা ব্যারিয়ারও। এর মধ্যে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কালিকাপুরের রেল সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির পরও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে টেকসই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
জিআরপি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে পাঁচজন, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন এবং মার্চে তিনজনের মৃত্যু হয় রেলে কাটা পড়ে। এরপর এপ্রিলে নয়জন, মে মাসে তিনজন, জুনে আটজন এবং জুলাইয়ে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত হয়। চলতি মাসের পঁচিশ তারিখ পর্যন্ত আরও চারজনের মৃত্যু যোগ হয়ে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় চল্লিশে।
জেলাওয়ারি হিসাবে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পাংশা, মাছপাড়া, কালুখালী, পাংশুরিয়া, সূর্যনগর ও খানখানাপুর এলাকায় প্রাণ হারিয়েছেন পনেরোজন। ফরিদপুরের তালমা, কুমারডাঙ্গা, বাখুণ্ডা, নগরকান্দা, মধুখালীসহ দশটি পয়েন্টে মারা গেছেন ষোলোজন। গোপালগঞ্জের মহেষপুর ও কাশিয়ানী মিলিয়ে চারজন এবং মাদারীপুরের শিবচর ও বন্দরখোলা এলাকায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে এই সময়ে শরীয়তপুরে এ ধরনের কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি।
সরেজমিন পরিদর্শনে কালিকাপুর রেল সেতু এলাকায় গিয়ে দেখা যায় উদ্বেগজনক চিত্র। ব্রিটিশ আমলে তৈরি এই সেতুর কাঠামো এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে, অথচ বর্তমান সময়ের ট্রেনের বগি ও ইঞ্জিনের আকার আগের চেয়ে অনেকটাই বড় হয়েছে। ফলে সেতুর ভেতরের ফাঁকা জায়গা তুলনামূলকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ছাদে চড়া যাত্রীরা প্রায়ই সেতুর কাঠামোর সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিচে ছিটকে পড়েন, যা এই এলাকাকে দুর্ঘটনাপ্রবণ করে তুলেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এই সেতু তৈরির পর থেকেই এখানে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, যে কারণে আশপাশের মানুষ একে “লাল সেতু” নামেই চেনেন। তার ভাষ্যে, সেতুর উচ্চতা এতটাই কম যে ছাদে থাকা কোনো যাত্রীর বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে; কেউ প্রাণে বাঁচলেও সারাজীবনের জন্য পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়।
আরেকজন বাসিন্দা জানান, আগে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিচয় শনাক্ত না হলে মরদেহ দীর্ঘসময় খোলা জায়গায় পড়ে থাকত। বর্তমানে অবশ্য পুলিশ দ্রুত এসে মরদেহ উদ্ধার করে; পরিচয় মিললে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, না মিললে সরকারিভাবে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, এত মৃত্যুর পরও রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কোনো নড়াচড়া দেখা যাচ্ছে না। তাদের মতে, হয় সেতুর ওপরের কাঠামো ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করতে হবে, নয়তো এর উচ্চতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা ঠেকাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানান তারা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাংশা উপজেলার মাছপাড়া থেকে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় অন্তত একশোটি স্থানে রেললাইন সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। কোথাও অনুমোদনহীনভাবে গড়ে উঠেছে ক্রসিং, কোথাও নেই কোনো প্রতিবন্ধক ব্যবস্থা, আবার কোথাও গেটম্যানের অনুপস্থিতিতে ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ। সামান্য অসতর্কতাতেই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা, ফলে বছরজুড়েই বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল।
কালুখালীর একটি বাজার এলাকার অরক্ষিত ক্রসিং প্রসঙ্গে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী জানান, ওই জায়গায় কোনো গেট বা গেটম্যান না থাকায় ট্রেন এলেই প্রায়ই যানবাহন আটকা পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়, যাতে নিয়মিত মানুষ হতাহত হচ্ছেন। দ্রুত গেটম্যান নিয়োগ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিং বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে স্থানীয় রেল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা জানান, রেলপথ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ যোগাযোগমাধ্যম হলেও কিছু যাত্রীর অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। তিনি ছাদে চড়ে ভ্রমণ না করার এবং সতর্কতার সঙ্গে রেলপথ পারাপারের আহ্বান জানান। তার দাবি, স্টেশনে ট্রেন পৌঁছানোর আগে যাত্রীদের সচেতন করতে নিয়মিত মাইকিং করা হয়। পাশাপাশি অরক্ষিত রেলপথ সংস্কারের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি, এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন।

