উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা, ইজারা স্থগিতাদেশ এবং একের পর এক অভিযান সত্ত্বেও কুষ্টিয়া-পাবনা সীমান্তবর্তী পদ্মা নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন থামছে না কিছুতেই। শিলাইদহ ঘাট, পদ্মা-গড়াইয়ের মোহনা, বেলতলা, কলাবাগান ও চর তারাপুর—এই পাঁচটি জায়গা থেকেই প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকা মূল্যের বালু তোলা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, এই কারবারের সঙ্গে যুক্ত আছেন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরাও। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, বেশিরভাগ উত্তোলন হয় রাতের অন্ধকারে, তা-ও সশস্ত্র পাহারায়। বাইরের কেউ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় ঢুকলেই নদীপাড়ের বাসিন্দারা উত্তোলনকারীদের আগেভাগে সতর্ক করে দেন। বড় নৌযানে করে তোলা বালু প্রথমে নদীতীরের ডিপোতে জমা হয়, পরে ট্রাকযোগে ছড়িয়ে যায় দেশের নানা প্রান্তে।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, জেলায় বর্তমানে কোনো বৈধ বালু মহাল নেই। বাইরে থেকে আসা বালু সংরক্ষণের জন্য পাঁচটি বালু মহাল তৈরির প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। তাঁর ভাষ্যে, বালু মহালের নামে অবৈধ উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়ার পরই সেগুলো নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, আর জড়িত গোষ্ঠীগুলো সশস্ত্র হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ব্যবসার সঙ্গে পরিচিতদের হিসাব বলছে, কুষ্টিয়া ও পাবনা—দুই প্রান্ত মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন লাখ ঘনফুট বালু অন্তত পঞ্চাশটি নৌযানে তোলা হয়। প্রতি ঘনফুটের বাজারমূল্য প্রায় ত্রিশ টাকা ধরলে দৈনিক মোট মূল্য দাঁড়ায় এক কোটি টাকার বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একজনের হিসাবে, বৈধ হলে প্রতি ঘনফুটে অন্তত চার টাকা রাজস্ব পেত প্রশাসন—অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় চৌদ্দ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
প্রায় ত্রিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদী-অংশে বর্তমানে কোনো বৈধ ইজারা নেই; দুই পাড়েরই সব ইজারা স্থগিত। ২০২৩ সালের মার্চে হাইকোর্ট গোয়ালন্দ থেকে পাকশী পর্যন্ত পদ্মায় অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ দেন, যার আওতায় কুষ্টিয়াও পড়ে। ২০২৫ সালের মার্চে চূড়ান্ত রায়েও সেই আদেশ বহাল রাখা হয়। আইন অনুযায়ী ভাঙন ও পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ড্রেজিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে একজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ বলেন, বালু তোলা নিজে থেকে ক্ষতিকর নয়; সমস্যা হয় কখন, কোথায় ও কী পরিমাণে তোলা হচ্ছে তার ওপর। নদীর তলদেশে বড় গর্ত তৈরি হয়ে পানির প্রবাহ তীরের দিকে সরে গেলে ভাঙন বাড়ে, আর মাছের প্রজনন মৌসুমে উত্তোলন হলে তা পরিবেশগত ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সাংবাদিকদের একটি দল জুলাই মাসে কয়েক দিন ধরে বালু উত্তোলনের স্থান ও ডিপো ঘুরে দেখেন এবং এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত পনেরোজনের বেশি ব্যক্তি, স্থানীয় বাসিন্দা, সাংবাদিক, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, বারবার ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও অবৈধ উত্তোলন চলছে প্রকাশ্যেই।
মহাসড়কে বালুবাহী ট্রাকের গতিবিধি অনুসরণ করে দেখা যায়, কুমারখালীর একটি ঘাট থেকে তোলা বালু পাঠানো হচ্ছে যশোরে। এক ডিপোতে ক্রেতা সেজে কথা বলার সময় সংশ্লিষ্ট একজন জানান, প্রশাসনের কড়াকড়ির কারণে ব্যবসা আগের তুলনায় কমেছে, তবে ভালো মানের বালুর জন্য অন্য একটি ঘাটে যাওয়ার পরামর্শও দেন তিনি। তিনি আরও দাবি করেন, একটি সেনাবাহিনী পরিচালিত নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের জন্যও ব্যাপক হারে বালু তোলা হয়েছে।
একাধিক ঘাটে বিশাল বালুর স্তূপ ও বালু নামানোর যন্ত্রপাতি দেখা গেছে। অবৈধভাবে মজুত বালু থেকে গড়ানো পানিতে নদীতীর সংরক্ষণের জিওব্যাগ নষ্ট হচ্ছে—এমন অভিযোগ পাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে যান। তিনি জানান, ডিপো সরানোর দাবিতে বাসিন্দারা মানববন্ধনও করেছেন।
কুষ্টিয়ার রাজস্ব সংক্রান্ত এক প্রশাসনিক কর্মকর্তার তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১৪২টি অভিযান চালানো হয়েছে, যার ৬৪টি ছিল ভ্রাম্যমাণ আদালতের। এতে ১৯ জনকে কারাদণ্ড, দুটি মামলা, প্রায় ৪০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় এবং কয়েকটি এক্সকাভেটর ও ডাম্প ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। তারপরও জুলাই মাসের মাঝামাঝি একটি মোহনায় একসঙ্গে সাতটি নৌযানকে সক্রিয়ভাবে বালু তুলতে দেখা গেছে।
এই কারবারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনাও নতুন নয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে অবৈধ বালু উত্তোলন নিয়ে অনুসন্ধানের সময় ছয়জন সাংবাদিক হামলার শিকার হন, তাঁদের নৌযান ডুবিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা হয়। চলতি বছরের এপ্রিলে একটি অভিযানের সময় সশস্ত্র হামলায় পুলিশের পাঁচ সদস্যসহ ছয়জন আহত হন। পুলিশের একটি নৌ ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। ফাঁড়ির প্রধান পরে জানান, পুলিশ কোনো অনিয়মে জড়িত নয়, বরং অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে গিয়েই তাঁদের সদস্যরা আহত হয়েছেন—নদীপুলিশের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের যে অভিযোগ উঠেছিল, তা তিনি অস্বীকার করেন।
গত বছরের নভেম্বরে অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ একটি চিঠিতে সংশ্লিষ্ট তিন জেলার প্রশাসন ও পুলিশকে অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করে। চিঠি অনুযায়ী তখন ওই এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানই একমাত্র বৈধ ইজারাদার ছিল, কুষ্টিয়া বা পাবনায় কোনো বৈধ ইজারাদার ছিল না। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ইজারার মেয়াদ ফুরানোর পরও সাবেক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে উত্তোলন চালিয়ে যাওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারিয়েছে।
কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা একাধিক ব্যক্তি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং কেউ কেউ এটিকে ভিন্ন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করেছেন। অভিযুক্তদের মধ্যে একজন জনপ্রতিনিধির পরিবার এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন, আরেকজন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দুর্নীতিবিরোধী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার বাংলাদেশ শাখার নির্বাহী পরিচালক এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার এমন অপব্যবহার বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়—বরং এটি প্রমাণ করে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন পক্ষের সবকিছু নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা কতটা গভীরে প্রোথিত। তাঁর মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মুখ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু জবাবদিহিহীন ক্ষমতা অপব্যবহারের চর্চায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা সাম্প্রতিক আন্দোলনে প্রকাশ পেয়েছিল, তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

