দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে, যেখানে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইনত নিষিদ্ধ, সেখানেই নতুন করে গড়ে উঠছে অন্তত ১২টি রিসোর্ট ও কটেজ। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দ্বীপবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই এই নির্মাণযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, আগের সরকারের পতনের আগে দ্বীপে নতুন করে ৭০টিরও বেশি রিসোর্ট তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব রিসোর্টের বিরুদ্ধে মামলা ও জরিমানার মতো ব্যবস্থা নেওয়ায় নতুন নির্মাণ অনেকটাই থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সাক্ষাৎকারে জানা গেছে, পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার পর বৈরী আবহাওয়ায় যখন টেকনাফের সঙ্গে দ্বীপের নৌ যোগাযোগ প্রায় বন্ধ থাকে, ঠিক তখনই আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে নির্মাণকাজ। কেয়াবন ও নারকেলগাছ কেটে ফেলা, সৈকত থেকে বালু ও চুনাপাথর সংগ্রহ এবং সম্পূর্ণ পরিকল্পনাহীনভাবে অবকাঠামো তৈরির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছে এই কার্যক্রম।
দুই বছর আগে পর্যটক প্রবেশ সীমিত করার সিদ্ধান্তের পর দ্বীপের প্রকৃতিতে কিছুটা উন্নতির লক্ষণ দেখা গিয়েছিল, কিন্তু এখন একের পর এক নতুন স্থাপনার কারণে সেই ইতিবাচক ধারা আবার হুমকির মুখে। পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, গত তিন দশকে দ্বীপে ২৩০টির বেশি হোটেল-রিসোর্ট-কটেজ নির্মিত হয়েছে, আর সাম্প্রতিক ও চলমান নির্মাণ যোগ হলে এই সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে যাবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় নয় কোটি টাকার একটি প্রকল্প চলমান থাকা সত্ত্বেও এই অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না।
গত ৮ আগস্ট পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রী সেন্ট মার্টিন পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নাগরিক সমাজ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং অবৈধ নির্মাণ বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরকে আরও কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে তিনি জানান, এসব অপরিকল্পিত স্থাপনা দ্বীপের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি, তাই সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সংস্থাগুলোকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
তবে বাস্তবতা ভিন্ন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্বীপে নির্মাণসামগ্রী নেওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি থাকা সত্ত্বেও নানা কৌশলে ইট, বালু, রড ও সিমেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে। এমনকি উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আনা সরকারি নির্মাণসামগ্রীর একটি অংশ বেসরকারি রিসোর্ট নির্মাণে ব্যবহার বা বিক্রি হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশিরভাগ রিসোর্টের মালিক দ্বীপের বাইরের, এমনকি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এর সঙ্গে জড়িত। নির্মাণকাজ তদারকি, শ্রমিক সরবরাহ এবং নির্মাণসামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার কাজে স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।
সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এবং দেশের সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। এক সময় এখানে প্রায় ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য থাকলেও গত দুই দশকে প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে অনেক প্রজাতি হারিয়ে গেছে। বর্তমানে পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের আওতায় কেয়াবন সৃজন, প্রবাল ও সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং কাছিমের ডিম সংগ্রহ-সংরক্ষণের কাজ চলছে, যা দ্বীপকে জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষায় সহায়ক।
উল্লেখ্য, ১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যদিও তারপরও অবৈধ নির্মাণ কখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালের আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার পর্যটক সংখ্যা সীমিত করে দেয়—নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে দৈনিক দুই হাজার পর্যটকের সুযোগ রেখে বছরের বাকি সময় দ্বীপ প্রায় পর্যটকশূন্য রাখা হয়। এতে গত দুই মৌসুমে মোট পর্যটক সংখ্যা তিন বছর আগের তুলনায় অর্ধেকেরও কমে আসে, যদিও তাতেও কেয়াবন রক্ষা করা যায়নি।
দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়া, পূর্ব পাড়া, গলাচিপা ও কোনারপাড়া মিলিয়ে একাধিক জায়গায় একযোগে চলছে নির্মাণকাজ—কোথাও ছাদ ঢালাই, কোথাও পিলার তোলা, আবার কোথাও টিন ও ইটের দেয়াল দিয়ে তৈরি হচ্ছে একের পর এক কটেজ। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে সৈকতের বালু ও মূল্যবান চুনাপাথর, যার ফলে ধ্বংস হচ্ছে কেয়াবনও।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়সংলগ্ন এলাকাতেই দেখা গেছে একটি রিসোর্টের নির্মাণকাজ, যেখানে ইতিমধ্যে দশটি কটেজ তৈরি সম্পন্ন হয়েছে। নির্মাণ শ্রমিকদের ভাষ্যমতে, এই রিসোর্টের মালিক ঢাকার এক প্রভাবশালী ব্যক্তি, আর স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কয়েকজন নেতা-কর্মী এর নির্মাণ তদারকি ও সামগ্রী সরবরাহে যুক্ত।
দ্বীপের দক্ষিণ পাড়ায় নির্মিত হচ্ছে একটি রিসোর্ট, যার মালিক বলে জানা গেছে সাবেক এক সংসদ সদস্যকে, যদিও শ্রমিকরা তার নাম নিশ্চিত করতে পারেননি। দিয়ারমাথা এলাকায় নির্মিত হচ্ছে আরেকটি কটেজ, যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত একটি প্রশাসনিক পদবির নামে। দ্বীপের মধ্যভাগে নির্মাণাধীন আরেকটি রিসোর্টের ক্ষেত্রে জোয়ারের পানিতে জমি বিলীন হওয়ার শঙ্কা থাকলেও তার প্রতিরোধে সৈকতের বালু তুলে বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে। পশ্চিম সৈকতেও নারকেলগাছ কেটে আরেকটি রিসোর্ট নির্মাণাধীন, যার একতলার ঢালাই ইতিমধ্যে সম্পন্ন।
স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতা দলের কর্মীদের এই কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে বলেছেন, প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এসব নির্মাণকাজ চলছে, যা দলের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার লিখিত অনুমতি ছাড়া টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে নির্মাণসামগ্রী আনা নিষিদ্ধ। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আনা সামগ্রীর একাংশ হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে। একাধিক সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে সাম্প্রতিক মাসগুলোয় ইট, সিমেন্ট, রড ও বালু আনা হলেও বাস্তবে সেসব প্রকল্পের কাজ তেমন এগোয়নি বলে সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্মকর্তারা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতাকে বিলম্বের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, দ্বীপে নির্মিত সব রিসোর্ট-কটেজই অবৈধ এবং তিনি এসবের জন্য কোনো ট্রেড লাইসেন্স দেন না। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কারা রিসোর্ট নির্মাণ করছে তা দেখভালের দায়িত্ব মূলত পরিবেশ অধিদপ্তরের, তবে প্রকল্পের নির্মাণসামগ্রীর প্রাক্কলন অনুযায়ীই অনুমতি দেওয়া হয় এবং কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন নির্মাণের পাশাপাশি দ্বীপে আগে থেকে থাকা অন্তত ষোলোটি রিসোর্টে চলছে সংস্কারকাজ, যেখানেও ব্যবহৃত হচ্ছে সৈকতের প্রাকৃতিক চুনাপাথর, প্রবাল পাথর ও বালু। কয়েকজন রিসোর্ট মালিক ও ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন মহলকে সন্তুষ্ট করেই এসব নির্মাণ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলার পরও কাজ থেমে থাকে না।
সেন্ট মার্টিন পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিবেশ সংক্রান্ত মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরই করে, ফলে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় অবৈধ নির্মাণ হলেও পুলিশের সরাসরি ভূমিকা সীমিত। পুরো দ্বীপের জন্য পুলিশ ফাঁড়িতে জনবলও মাত্র চারজন।
২০১১ সালে হাইকোর্ট এক রায়ে সেন্ট মার্টিনে পরিবেশগত ছাড়পত্রহীন সব স্থাপনা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর ২০১৭ সালে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর পরিবেশ অধিদপ্তর অবৈধ ৩৮টি হোটেল ভাঙার নোটিশ দেয়। পরবর্তী সময়ে অর্ধশতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, একাধিক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা এবং একাধিক মামলার মাধ্যমে বহু রিসোর্ট মালিক-ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও আইনি জটিলতার কারণে বেশিরভাগ জরিমানার অর্থ আদায় সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের একজন পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা এ বিষয়ে মন্তব্য করে বলেছেন, নির্বাচনের সময় প্রার্থীদের মধ্যে জীববৈচিত্র্যের চেয়ে মানুষের চাহিদাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে, যা দ্বীপ রক্ষার পথে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। তার মতে, বহিরাগত অর্থনৈতিক স্বার্থের চাপ থেকে দ্বীপকে বাঁচাতে জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক কঠোরতা প্রয়োজন, আর এক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে কার্যকর ভূমিকা রাখা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে দ্বীপের জীববৈচিত্র্য রক্ষার চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার সুযোগে চলছে অবৈধ নির্মাণ—এই দ্বিমুখী বাস্তবতাই সেন্ট মার্টিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

