রাজধানীর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৮ তলার বারান্দায় উঠে আসা তিনটি সাপের বাচ্চাকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপগুলো নির্বিষ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল এবং প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের খবর দিলে এগুলো নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব ছিল। অন্যদিকে, তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী হত্যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
বৃহস্পতিবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে তিনটি সাপের বাচ্চাকে দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠতে দেখা যায়। পরে সেগুলোকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।
সাপ-গবেষক আবু সাইদ ঘটনার ভিডিও দেখে ধারণা করেছেন, সাপগুলো পাতি নেকড়ে সাপ হতে পারে। তাঁর মতে, এই প্রজাতির সাপ নির্বিষ এবং খাড়া দেয়াল, পাইপ ও তার বেয়ে উঠতে সক্ষম।
ঘটনাটি শুধু একটি বন্য প্রাণী হত্যার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, দেশের প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ের মতো জায়গায় সাপ দেখার পর সেটিকে উদ্ধার না করে হত্যা করার ঘটনা জনসচেতনতার ক্ষেত্রে নেতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ও সরকার গঠিত বন্যপ্রাণী কমিশনের সদস্য রেজা খান বলেন, কোনো জায়গায় সাপ দেখা গেলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এরপর প্রশিক্ষিত ব্যক্তি বা সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে খবর দিয়ে সাপটি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত।
তিনি বলেন, ঢাকায় বর্তমানে একাধিক সংগঠন সাপ উদ্ধারে কাজ করছে। তাদের খবর দিলে সচিবালয় থেকেও সাপগুলো উদ্ধার করা সম্ভব ছিল। তাঁর মতে, বন্য প্রাণী দেখলেই মেরে ফেলার প্রবণতা বন্ধ করা জরুরি।
ঘটনার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ বিভাগের দুজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বন অধিদপ্তরও বলছে, সচিবালয়ে সাপের বাচ্চা পাওয়ার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো খবর দেওয়া হয়নি। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে পরে তারা ঘটনাটি জানতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, মানুষের অসচেতনতার কারণে বন্য প্রাণী সংরক্ষণে এমনিতেই নানা সমস্যা রয়েছে। সচিবালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এ ধরনের ঘটনা সচেতনতা তৈরির উদ্যোগকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।
আইনে কী বলছে?
বন্য প্রাণী হত্যা বা আহত করার ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, আইনি বিষয়ও রয়েছে। ‘বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬’-এ তফসিলভুক্ত বন্য প্রাণী শিকার, ধরা, আহত করা ও হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
আইনের তফসিল-২-এ পাতি নেকড়ে সাপের নাম রয়েছে। ফলে সচিবালয়ে মারা যাওয়া সাপগুলো যদি এই প্রজাতির হয়ে থাকে, তাহলে আইনটির সংশ্লিষ্ট বিধান প্রযোজ্য হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ শাস্তি এক বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড। একই অপরাধ পুনরায় করলে সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
বন্য প্রাণী সুরক্ষার বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও রয়েছে। বাংলাদেশ ১৯৯৪ সালের ১ আগস্ট জীববৈচিত্র্য সনদের পক্ষভুক্ত হয়। এই আন্তর্জাতিক চুক্তির মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, এর উপাদানগুলোর টেকসই ব্যবহার এবং জীববৈচিত্র্য থেকে পাওয়া সুবিধার ন্যায্য বণ্টন।
তবে সচিবালয়ের ঘটনায় আইনের কোনো ধারা প্রয়োগ হবে কি না, তা নির্ভর করবে সাপের প্রজাতি, ঘটনার প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপর।
১৮ তলায় সাপ কীভাবে?
সচিবালয়ের ১৮ তলার বারান্দায় সাপের বাচ্চাগুলো কীভাবে পৌঁছাল, তার নিশ্চিত কোনো ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বন অধিদপ্তরের বন সংরক্ষক মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, কিছু প্রজাতির সাপ গাছ কিংবা ভবনের বিভিন্ন কাঠামো বেয়ে ওপরে উঠতে পারে। ভবনের কাছাকাছি গাছ থাকলে সেটিও সাপের ওপরে ওঠার একটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে।
উদ্ধার না করে হত্যা কেন?
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দ্রুত নগরায়ণের মধ্যেও বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী টিকে আছে। সাপও এর একটি অংশ। ‘ডিপ ইকোলজি অ্যান্ড স্নেক রেসকিউ ফাউন্ডেশন’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা সৈয়দা অনন্যা ফারিয়ার মতে, ঢাকার ইট-পাথরের পরিবেশেও বন্য প্রাণীর অস্তিত্ব রয়েছে এবং সাপ উদ্ধারে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও রয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, খবর দেওয়া হলে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সাপগুলো উদ্ধার করা সম্ভব ছিল। দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সচিবালয়ে একটি বন্য প্রাণী নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে হত্যা করার ঘটনা তাই হতাশাজনক।
ঘটনাটি শেষ পর্যন্ত একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—বন্য প্রাণী মানুষের বসতিতে ঢুকলে প্রথম প্রতিক্রিয়া কি হত্যা, নাকি নিরাপদ উদ্ধার? বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য ও প্রচলিত আইনের বিধান বলছে, ভয় বা আতঙ্কের বদলে প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীর সহায়তা নেওয়াই দায়িত্বশীল পথ।

