ঢাকায় কেউ কোথায় থাকেন—এই একটি তথ্য থেকেই অনেক সময় তার জীবনযাত্রা, আয়, সামাজিক অবস্থান এমনকি প্রতিদিনের যাতায়াতের কষ্ট সম্পর্কেও ধারণা করে নেওয়া হয়। গুলশান বা বনানীর নাম শুনলে স্বচ্ছলতা ও সুযোগ–সুবিধার ছবি সামনে আসে। ধানমন্ডি মানে পুরোনো নাগরিক মর্যাদা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির আবহ। উত্তরা মানে তুলনামূলক বড় বাসা, কিন্তু দীর্ঘ যাত্রা। মিরপুর কিংবা মোহাম্মদপুর মধ্যবিত্তের বিশাল আবাসিক জগত। আবার শহরের প্রান্তে বা নদীর ওপারে বসবাস মানেই অনেকের চোখে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়া, তবে তার বিনিময়ে দীর্ঘ পথ।
কিন্তু ঢাকায় জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় শুধু বাড়িভাড়ার অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না।
বাস্তবে একজন মানুষ কোথায় থাকবেন, সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অন্তত তিন ধরনের খরচ—টাকা, সময় এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা। শহরের এক অংশে ভাড়া বেশি হলে যাতায়াতের সময় কমতে পারে। আবার কম ভাড়ার এলাকায় গেলে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা বেশি রাস্তায় কাটাতে হতে পারে। কোথাও পানি, গ্যাস বা পরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করতে ব্যক্তিগতভাবে বাড়তি টাকা খরচ করতে হয়।
অর্থাৎ ঢাকায় ঠিকানা বদলালে খরচ হারিয়ে যায় না; কেবল খরচের ধরন বদলে যায়।
ভাড়াই শুধু খরচ নয়, বাসা নেওয়ার আগেই বড় অঙ্কের চাপ
ঢাকায় অধিকাংশ মানুষের জন্য আবাসন মানেই ভাড়া বাসা। শহরের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ নিজের বাড়ির পরিবর্তে ভাড়া বাসায় থাকেন। ফলে বাড়িভাড়ার সামান্য পরিবর্তনও বিপুলসংখ্যক মানুষের মাসিক বাজেটে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
নতুন বাসা নেওয়ার সময় অনেক ভাড়াটিয়াকেই দুই থেকে তিন মাসের ভাড়া অগ্রিম দিতে হয়। অথচ বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১–এর ধারা ২৩ অনুযায়ী এক মাসের বেশি অগ্রিম নেওয়া বৈধ নয়। বাস্তবে বাসার চাহিদা বেশি এবং বিকল্প কম থাকায় অধিকাংশ ভাড়াটিয়া মালিকের শর্ত মেনেই বাসায় ওঠেন।
ভাড়ার নিয়মিত বৃদ্ধিও আরেকটি বড় সমস্যা। বাড়িভাড়া সূচকের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই–সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বাড়িভাড়া ৫.১৯ শতাংশ বেড়েছে। এটি ছিল টানা তৃতীয় প্রান্তিকের বৃদ্ধি।
আইনে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী একবার আদর্শ ভাড়া নির্ধারিত হওয়ার পর সাধারণভাবে দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগে তা আবার বাড়ানোর সুযোগ থাকার কথা নয়। কিন্তু ঢাকার বাস্তব আবাসন বাজারে সেই বিধান কতটা কার্যকরভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে পরিবারের আয় একই থাকলেও বাসস্থান ধরে রাখার খরচ ক্রমে বাড়তে থাকে।
পানি বিনা মূল্যে আসে না, নিরাপদ করতে আবার খরচ
বাড়িভাড়া দেওয়ার পরও একটি পরিবার যে মৌলিক নাগরিক সুবিধাগুলো পাবে, তার নিশ্চয়তা নেই।পানি তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ।
ঢাকার পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেই নাগরিকদের সরবরাহ করা পানি পান করার আগে ফুটিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের একটি হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার মানুষ সরবরাহ করা পানি বিশুদ্ধ করার জন্য বছরে প্রায় ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাস পোড়ান।
অর্থাৎ একজন নাগরিক পানির বিল দিচ্ছেন, আবার সেই পানি নিরাপদ করার জন্য আলাদা জ্বালানি ব্যবহার করছেন।
যেসব এলাকায় পানির মান আরও খারাপ, সেখানে অনেকে জারের পানি কিনে ব্যবহার করেন। ফলে মাসিক খরচে নতুন একটি অঙ্ক যুক্ত হয়।
গ্যাসের বিল আছে, কিন্তু রান্নার গ্যাস নেই
ঢাকার অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ থাকে না। কোথাও মধ্যরাতের পর কয়েক ঘণ্টার জন্য গ্যাস পাওয়া যায়, আবার সকাল সাতটার পর চাপ কমে যায়।
এ অবস্থায় পরিবারের সামনে কয়েকটি বিকল্প থাকে—রাত জেগে রান্না করা, তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের সিলিন্ডার কেনা অথবা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে রান্না করা।কিন্তু প্রতিটি বিকল্পেরই আলাদা খরচ আছে।
একটি সিলিন্ডারের সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা হলেও সংকটের সময় অনেক পরিবারকে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতে রান্না করলে আবার বিদ্যুৎ বিল বাড়ে এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অর্থাৎ বাসার ভাড়ার বাইরে নাগরিককে সেই সেবার জন্যও বাড়তি অর্থ দিতে হচ্ছে, যা নগর অবকাঠামো থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে পাওয়ার কথা ছিল।
কম ভাড়ার খোঁজে শহরের কিনারায়, কিন্তু সাশ্রয় কতটা?
স্কুলশিক্ষক সৈয়দা সালেহার পরিবারের অভিজ্ঞতা ঢাকার হাজারো ভাড়াটিয়া পরিবারের বাস্তবতার সঙ্গে মিলে যায়।
গত নয় বছরে তিনি পরিবার নিয়ে চারবার বাসা বদলেছেন। মোহাম্মদপুরের বাবুর রোড থেকে শেখেরটেক, সেখানে আবার একাধিক বাসা এবং পরে বসিলা—প্রতিবারই লক্ষ্য ছিল তুলনামূলক কম ভাড়ায় থাকা।
কাগজে-কলমে নতুন বাসার ভাড়া কম মনে হলেও পরিবার বড় হওয়ার সঙ্গে প্রয়োজন বেড়েছে। বেশি ঘর দরকার হয়েছে। নতুন এলাকায় পানির সমস্যা থাকায় পানি কেনার খরচ এসেছে। গ্যাস না থাকায় সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। দূরত্ব বাড়ায় রিকশা ও অন্যান্য যাতায়াত ব্যয়ও বেড়েছে।
ফলে কয়েক মাস পর দেখা গেছে, কম ভাড়ায় বাসা নেওয়ার যে সাশ্রয় প্রথমে চোখে পড়েছিল, অন্যান্য ব্যয় সেটি প্রায় পুরোপুরি শুষে নিয়েছে।ঢাকার আবাসন ব্যবস্থার একটি বড় বৈপরীত্য এখানেই—সস্তা বাসা সবসময় সস্তা জীবন নিশ্চিত করে না।
বড় বাসা নাকি ছোট যাতায়াত—দুটো একসঙ্গে পাওয়া কঠিন
সাদাফ কাজ করেন কারওয়ান বাজারে। তুলনামূলক খোলামেলা পরিবেশ এবং বড় বাসার জন্য তিনি একসময় আফতাবনগরের প্রান্তে বাসা নিয়েছিলেন। তার একটি মোটরসাইকেল থাকায় শুরুতে দূরত্ব খুব বড় সমস্যা মনে হয়নি।কিন্তু জ্বালানি সংকট পুরো হিসাব বদলে দেয়।
মার্চের শুরুতে আমদানি ব্যাহত হওয়ার পর জ্বালানি বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ আসে। ঢাকার বিভিন্ন পাম্পে দীর্ঘ সারি দেখা যায়। ২০ এপ্রিল ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের দাম লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানো হয় এবং অকটেনের দাম দাঁড়ায় ১৪০ টাকা।
কয়েক সপ্তাহ মোটরসাইকেলের জন্য জ্বালানি পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। ফলে অনেক দিন তাকে বাসে অফিসে যেতে হয়েছে, আর সেই যাত্রায় সময় লেগেছে অনেক বেশি।
শেষ পর্যন্ত তিনি অফিসের কাছাকাছি চলে আসেন।ভাড়া প্রায় একই। কিন্তু নতুন বাসা ছোট, আলো-বাতাসও তুলনামূলক কম।
অর্থাৎ তিনি অতিরিক্ত জায়গার সুবিধা ছেড়ে দিয়েছেন কম যাতায়াত সময়ের জন্য।ঢাকায় আবাসনের সিদ্ধান্ত প্রায়ই এমন—একটি সুবিধা পেতে আরেকটি ত্যাগ করতে হয়।
বিশ্বের ধীরতম শহরের একটি জীবন
ঢাকার সবচেয়ে বড় অদৃশ্য ব্যয় সম্ভবত সময়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণায় ১ হাজার ২০০টির বেশি শহরের যানবাহনের গতি বিশ্লেষণ করে ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধীর শহর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেখানে গড় চলাচলের গতি ছিল ঘণ্টায় মাত্র ৪.৮ কিলোমিটার—যা অনেক মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির কাছাকাছি।
ফলে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতেও সকালে দুই ঘণ্টা এবং সন্ধ্যায় ফেরার সময় আরও দুই ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যেতে পারে।
একজন মানুষের প্রতিদিন চার ঘণ্টা রাস্তায় চলে গেলে সপ্তাহে পাঁচ কর্মদিবসে সেটি দাঁড়ায় ২০ ঘণ্টা। মাসের হিসাবে এই সময় একজন মানুষের জীবনের কয়েকটি সম্পূর্ণ দিনের সমান।কিন্তু এই সময়ের কোনো বেতন নেই।
পরিবারের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ, ঘুম, ব্যায়াম, পড়াশোনা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কিংবা বিশ্রাম—সবকিছু থেকেই এই সময় কেটে নেওয়া হয়।
কম ভাড়ার দাম দিতে হয় সময় দিয়ে
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খালেদ আহমেদ থাকেন ঢোলাইপাড়ে, কিন্তু কর্মস্থল বনানীতে।তার বাসাভাড়া বনানীর কাছাকাছি থাকা সহকর্মীদের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। প্রথম দেখায় এটি বড় সাশ্রয়।
কিন্তু প্রতিদিন তাকে সকাল সাতটার দিকে বের হতে হয় এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা পর কর্মস্থলে পৌঁছাতে হয়। সন্ধ্যার যাত্রা আরও দীর্ঘ হতে পারে। মোট ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা প্রতিদিন, সপ্তাহে পাঁচ দিন, তার রাস্তায় চলে যায়।
অর্থের হিসাবে তিনি কম ভাড়া দিচ্ছেন। কিন্তু সময়ের হিসাবে সেই ছাড়ের মূল্য অনেক বেশি।
এই বাস্তবতা ঢাকার মধ্যবিত্তের আবাসন সংকটকে খুব স্পষ্ট করে। কাছাকাছি থাকা মানে বেশি ভাড়া, আর দূরে থাকা মানে বেশি সময় ও পরিবহন ব্যয়।
নিম্ন আয়ের মানুষের সামনে পছন্দ আরও কম
মধ্যবিত্ত পরিবার অন্তত হিসাব করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে—বেশি ভাড়া দেবে, নাকি দূরে থাকবে।নিম্ন আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্তের সুযোগও অনেক সময় থাকে না।
আশুলিয়ার একজন পোশাকশ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলে প্রতিদিনের পরিবহন ব্যয় তার আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে যেতে পারে। তাই অনেক শ্রমিক হেঁটে কর্মস্থলে যান।
একজন গৃহকর্মীকে সকাল দশটার আগেই একাধিক বাসায় পৌঁছানোর জন্য লেগুনা, বাস ও হাঁটা—সবকিছু মিলিয়ে শহরের বড় অংশ পাড়ি দিতে হতে পারে।
তারা সস্তা বাসা ও দ্রুত যাতায়াতের মধ্যে সুবিধাজনক কোনো একটি বেছে নিচ্ছেন না। বরং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাই তাদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
নারীর আবাসন সিদ্ধান্তে নিরাপত্তার আলাদা দাম
ঢাকায় নারীদের জন্য বাসা নির্বাচনের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জড়িত—নিরাপত্তা।
গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তাহমিনা চাইলে ত্রিমোহনীর কাছে পরিবারের সঙ্গে থাকতে পারতেন। কিন্তু সেখান থেকে নিয়মিত যাতায়াত করলে রাতে অন্ধকারে ফিরতে হতো এবং গণপরিবহনে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকত।
তাই তিনি বেশি ভাড়া দিয়ে কর্মস্থলের কাছাকাছি থাকেন।এখানে অতিরিক্ত ভাড়া আসলে শুধু জায়গার মূল্য নয়; এটি নিরাপদ যাতায়াতের জন্য দেওয়া অর্থও।
এর সঙ্গে নারীদের আরেকটি অদৃশ্য শ্রম যুক্ত হয়। দীর্ঘ সময় অফিস ও রাস্তায় কাটানোর পর বাসায় ফিরে রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলাতে হয়। এই দ্বিতীয় কর্মপর্বের কোনো আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয় না, কিন্তু ক্লান্তির হিসাবে এর প্রভাব খুব বাস্তব।
সন্তান এলে বাসার ঠিকানা নির্ধারণ করে স্কুল
স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হলে বাসা নির্বাচনের হিসাব আরও কঠিন হয়।
একটি বাসা একজনের অফিসের কাছে হলে অন্যজনের কর্মস্থল দূরে হতে পারে। সন্তান স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর অনেক পরিবারের অগ্রাধিকার আবার বদলে যায়।
ব্যাংক কর্মকর্তা রুমানা এবং তার স্বামী মেয়ের পছন্দের স্কুলের কাছে থাকার জন্য মিরপুরে বাসা নিয়েছেন। এর ফলে দুজনেরই অফিসে যাওয়ার দূরত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে।
অর্থাৎ পরিবারটি কাজের জায়গা দেখে আবাসন নির্বাচন করেনি; সন্তানের শিক্ষার সুবিধাই তাদের বাসার অবস্থান নির্ধারণ করেছে।
ঢাকার পরিবারগুলোর দৈনন্দিন পরিকল্পনা অনেক সময় এভাবেই একটি নির্দিষ্ট প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে সাজাতে হয়, তারপর বাকি সবকিছু সেই সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়।
দূষণ, তাপ আর রোগ—জীবনযাত্রার আরেক মূল্য
বাসস্থান ও যাতায়াতের বাইরেও ঢাকার মানুষের বড় একটি মূল্য দিতে হয় স্বাস্থ্যের মাধ্যমে।
আইকিউএয়ারের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বায়ুদূষণের দেশ ছিল। সূক্ষ্ম বস্তুকণার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরাপদ সীমার তুলনায় সর্বোচ্চ ১৩ গুণ পর্যন্ত ছিল।ঢাকার বাসিন্দারা প্রতিদিন এই দূষণের বড় অংশের মুখোমুখি হন।
এর সঙ্গে রয়েছে কংক্রিটে জমে থাকা তাপ, রাতেও দীর্ঘস্থায়ী গরম, নির্মাণকাজের ধুলা, যানবাহনের হর্ন এবং জেনারেটরের শব্দ ও ধোঁয়া।
বর্ষাকালে ডেঙ্গুর ঝুঁকিও বাড়ে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ঢাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে।
তবে শহরের স্বাস্থ্যব্যয় সবসময় হাসপাতালের বিল হিসেবে সামনে আসে না।অনেক সময় তা প্রকাশ পায় দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, ঘুমের ঘাটতি, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে।
মানুষ বিশ্রাম নেবে কোথায়?
একটি সুস্থ শহরে মানুষের শুধু বাসা ও কর্মস্থল থাকলেই চলে না। দরকার পার্ক, মাঠ, খোলা জায়গা এবং এমন কিছু স্থান যেখানে টাকা খরচ না করেও সময় কাটানো যায়।ঢাকায় সেই জায়গাগুলো দ্রুত কমেছে।
১৯৯৫ সালে নগরীর সবুজ ও উন্মুক্ত জায়গার পরিমাণ ছিল প্রায় ৫২ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালের মধ্যে তা কমে ৩০ বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে।দুই সিটি করপোরেশনের ৩৫টি ওয়ার্ডে একটি পার্ক বা খেলার মাঠও নেই।
বর্তমানে প্রায় ৩৭ হাজার ৯০০ মানুষের জন্য মাত্র এক একর পার্ক বা খেলার মাঠ রয়েছে। পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রয়োজনের মানদণ্ড হওয়া উচিত প্রতি ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য এক একর।অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় নাগরিক খোলা জায়গার ঘাটতি অত্যন্ত বড়।
ফলে বিশ্রামের জন্য মানুষকে প্রায়ই বাণিজ্যিক জায়গার ওপর নির্ভর করতে হয়—রেস্তোরাঁ, কফির দোকান, বিপণিবিতান বা টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয় এমন বিনোদনকেন্দ্র।বিশ্রামও তখন আর বিনা খরচের থাকে না।
ছুটির দিনও যানজটের কাছে বন্দী
ঢাকায় পাঁচ বা ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ শেষে শুক্রবার অনেকের জন্য বিশ্রামের একমাত্র সুযোগ।কিন্তু বাইরে কোথাও যেতে হলে আবার সেই যানজট, যাতায়াত খরচ এবং সময়ের হিসাব সামনে আসে।
৩১ বছর বয়সী সুমাইয়া চার বছর আগে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে কালাবাগানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। তিনি হাজারীবাগে একটি সাবলেট কক্ষে একা থাকেন।
সকালে আটটার দিকে বের হয়ে রাত নয়টার দিকে ঘরে ফেরার পর তার কর্মদিবসে ব্যক্তিগত সময় খুব কমই থাকে। শুক্রবার দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে ক্লান্তি কাটাতে কাটাতে দিনের বড় অংশ চলে যায়। তারপর কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা করলে যাতায়াতেই কয়েক ঘণ্টা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ফলে অনেক সপ্তাহ তিনি ঘরেই থাকেন।এখানে শহরের ব্যয় আর শুধু টাকায় সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক সম্পর্ক, অবসর এবং মানসিক সুস্থতার ওপরও চাপ পড়ে।
মাস শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় পরের মাসের ভয়
ঢাকার কর্মজীবী মানুষের আরেকটি বড় চাপ হলো অনিশ্চয়তা।আজকের আয় দিয়ে বর্তমান মাসের ভাড়া, বাজার, পরিবহন এবং অন্যান্য খরচ মেটানো গেলেও আগামী মাসে কী হবে, তা নিশ্চিত নয়।
বাসার মালিক ভাড়া বাড়াতে পারেন। পরিবারের কেউ অসুস্থ হতে পারেন। সন্তানের স্কুলে বাড়তি টাকা লাগতে পারে। হঠাৎ চাকরি চলে যেতে পারে। জ্বালানি বা খাদ্যের দাম বাড়তে পারে।
যাদের উল্লেখযোগ্য সঞ্চয় নেই, তাদের জন্য এসব ঘটনা সরাসরি আর্থিক সংকটে পরিণত হয়।ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মানসিক দুশ্চিন্তাও প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে।
নাগরিক সুবিধার ঘাটতিও ব্যক্তিগত খরচে পূরণ হচ্ছে
সাধারণভাবে বেশি ভাড়ার এলাকায় উন্নত ভবন, নিরাপত্তা, ভালো নিষ্কাশন ব্যবস্থা, লিফট কিংবা তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু ঢাকার মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়ের বড় একটি অংশ আসলে বিলাসিতা কেনার জন্য নয়।
অনেক পরিবারকে ব্যক্তিগতভাবে পানি কিনতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। পরিবহনের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে। বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটর বা অন্য ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে।
অর্থাৎ নগরসেবা নির্ভরযোগ্য না হলে নাগরিকরা সেই ঘাটতি নিজস্ব অর্থ দিয়ে পূরণ করেন।যারা সামর্থ্যবান, তারা বিকল্প কিনতে পারেন। যারা পারেন না, তাদের সেই ঘাটতির মধ্যেই জীবন চালাতে হয়।এ কারণে ঢাকায় আয়বৈষম্যের সঙ্গে জীবনযাত্রার মানের বৈষম্যও আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দ্রুত জনসংখ্যা বেড়েছে, অবকাঠামো এগোয়নি একই গতিতে
ঢাকার বর্তমান সমস্যাগুলোর পেছনে দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনাগত ঘাটতিও রয়েছে।
১৯৫১ সালে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার। ১৯৭৪ সালে তা প্রায় ২০ লাখ এবং ১৯৯১ সালে প্রায় ৬৫ লাখে পৌঁছায়।
বর্তমানে এই মহানগরে ২ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন। প্রতি বছর আরও আনুমানিক ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ মানুষ এখানে যুক্ত হচ্ছেন।
এত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানি, পয়োনিষ্কাশন, রাস্তা, গণপরিবহন, আবাসন ও খোলা জায়গা গড়ে ওঠেনি।
অবকাঠামোর অনেক প্রকল্প পরে এসেছে, অনেক ক্ষেত্রে অসমভাবে এসেছে, আবার অনেক এলাকাকে দীর্ঘদিন প্রায় উপেক্ষিত অবস্থায় থাকতে হয়েছে।
মহাপরিকল্পনা থেকে শুরু করে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বিস্তারিত অঞ্চল পরিকল্পনা তৈরি হলেও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা নগরজীবনে স্পষ্ট।
রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার এই ফাঁকে বেসরকারি আবাসন দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। যেখানে বাজার ছিল, সেখানে বহুতল ভবন তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জলাভূমি ও নিচু জমিও আবাসনে রূপান্তরিত হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক বসতিতে থাকেন। নগরকেন্দ্রের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি নির্মিত অবকাঠামোয় আচ্ছাদিত, আর সবুজ জায়গা ১০ শতাংশেরও কম।
এই পরিসংখ্যানগুলো বোঝায়, ঢাকার জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় কেবল ব্যক্তিগত আয় বা বাজারদরের সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনা, জনসংখ্যার চাপ এবং সেবা ব্যবস্থার সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
একই শহরে কেউ টাকা দেয়, কেউ সময়
ঢাকার জীবনকে শুধু ব্যয়বহুল বলা তাই পুরো বাস্তবতা প্রকাশ করে না।
একজন গুলশানে বেশি ভাড়া দিয়ে অফিসের কাছে থাকতে পারেন। আরেকজন ঢোলাইপাড়ে কম ভাড়া দিয়ে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় কাটান। কেউ সন্তানের স্কুলের জন্য দূরে যাতায়াত করেন। কেউ নিরাপত্তার জন্য পরিবারের বাড়ি ছেড়ে কর্মস্থলের কাছে আলাদা থাকেন। নিম্ন আয়ের কেউ যানবাহনের ভাড়া বাঁচাতে হেঁটে কর্মস্থলে যান।
সবাই একই শহরে থাকছেন, কিন্তু খরচ দিচ্ছেন ভিন্নভাবে।কারও মূল্য টাকা, কারও সময়, কারও ঘুম, কারও স্বাস্থ্য, আবার কারও সামাজিক জীবন।
এই কারণেই ঢাকার কোনো এলাকার ভাড়া তুলনামূলক কম হলেই সেখানে জীবনযাত্রার মোট ব্যয় কম হবে—এমন সিদ্ধান্ত সহজে দেওয়া যায় না।
বাসা থেকে কর্মস্থলের দূরত্ব, পানি ও গ্যাসের অবস্থা, পরিবহন সুবিধা, নিরাপত্তা, সন্তানের স্কুল, চিকিৎসাসেবা, খোলা জায়গা এবং প্রতিদিনের মানসিক চাপ—সবকিছু যোগ করেই প্রকৃত খরচ নির্ধারিত হয়।
শেষ পর্যন্ত ঢাকায় একজন মানুষ কোথায় থাকেন, সেই প্রশ্নটি শুধু তার সামর্থ্যের প্রশ্ন নয়।আরও গভীরে গেলে এটি আসলে একটি ত্যাগের হিসাব।
কম ভাড়ার জন্য তিনি কি নিজের সময় ছেড়ে দেবেন? ছোট বাসায় থেকে কি যাতায়াত কমাবেন? নিরাপত্তার জন্য কি বেশি ভাড়া দেবেন? সন্তানের শিক্ষার জন্য নিজের কর্মস্থল থেকে দূরে থাকবেন? নাকি মৌলিক নাগরিক সেবার ঘাটতি পূরণ করতে প্রতি মাসে বাড়তি অর্থ ব্যয় করবেন?
ঢাকার প্রতিটি ঠিকানার সঙ্গে তাই একটি অদৃশ্য মূল্যতালিকা জড়িয়ে আছে।
সেই মূল্য কখনো টাকায় লেখা থাকে, কখনো যানজটে হারানো ঘণ্টায়, কখনো ক্লান্ত শরীরে, আবার কখনো এমন একটি ছুটির দিনে—যেদিন শহরের বাইরে বের হওয়ার শক্তিটুকুও আর অবশিষ্ট থাকে না।

