আইন করে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে সরকারিভাবে ‘নীরব এলাকা’ ঘোষণাও করা হয়েছে—তবু রাজধানীর রাস্তায় হর্নের তাণ্ডব থামছে না। ঘোষিত নয়টি নীরব এলাকার কোথাও প্রকৃত অর্থে নীরবতা নেই বললেই চলে; সব ধরনের যানবাহনের অবিরাম ও মাত্রাতিরিক্ত হর্নের শব্দে অতিষ্ঠ পথচারী ও বাসিন্দারা।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট নয়টি এলাকাকে নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে বিমানবন্দরের আশপাশের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাকে নীরব ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর আগে সচিবালয় ও তার আশপাশ, আগারগাঁও, সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাও একই তালিকায় যুক্ত হয়েছিল। অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকেও নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল গত বছরের শুরুর দিকে।
শব্দদূষণ মোকাবিলায় গত বছর একটি নতুন বিধিমালা কার্যকর করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার, যেখানে অবৈধ হর্ন আমদানি, উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। পুরোনো বিধিমালার তুলনায় নতুন নিয়মে বড় পরিবর্তন হলো—আগে শুধু ম্যাজিস্ট্রেটরাই জরিমানা করতে পারতেন, এখন সার্জেন্ট বা তার ওপরের পদমর্যাদার ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরাও ঘটনাস্থলেই জরিমানা আদায় করতে পারছেন। নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা দশ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে, আর হর্ন উৎপাদন-আমদানি-বিক্রির সঙ্গে যুক্তদের জন্য শাস্তি আরও কঠোর—সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা।
কিন্তু আইন কড়া হলেও বাস্তব চিত্র প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে, ঘোষিত নীরব এলাকাগুলোর অন্তত চারটিতে শব্দের মাত্রা নির্ধারিত সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, সচিবালয়, আগারগাঁও, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকায় গড় শব্দের মাত্রা ছিল প্রায় ৯৮ ডেসিবেল, যা গ্রহণযোগ্য মানদণ্ডের প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সচিবালয় এলাকায় সর্বোচ্চ শব্দের মাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২৭ ডেসিবেল পর্যন্ত।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিমানবন্দর এলাকাকে নীরব ঘোষণা করার পরও সেখানকার শব্দের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি—বরং ঘোষণার পরপরই তা সামান্য বেড়ে যায়।
সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায়ও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। দেশি-বিদেশি একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ এই সমীক্ষায় ঢাকার ৬৭টি স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, শহরের কোনো আবাসিক বা নীরব এলাকাই রাতের শব্দমানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না। অথচ নিয়ম অনুযায়ী রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত শব্দের মাত্রা ৪০ থেকে ৬০ ডেসিবেলের মধ্যে থাকা উচিত।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী সড়কের শব্দ দিনে ৫৩ এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের নিচে থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঢাকার প্রায় সব বাসিন্দাই এই মানদণ্ডের চেয়ে বেশি শব্দের মধ্যে বসবাস করছেন, যাদের মধ্যে প্রায় নয় লাখ মানুষ ৭০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানিরা জানান, উচ্চমাত্রার হর্নের কারণে তারা প্রায়ই কানে ব্যথা ও মাথা ঘোরার সমস্যায় ভোগেন। এক অভিভাবক জানান, গাড়ির তীব্র শব্দে তার শিশুসন্তান আতঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং প্রায়ই মাথাব্যথার অভিযোগ করে। কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে অবৈধ হর্ন খুলে জরিমানা করলেও কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি আবার আগের মতো হয়ে যায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলছেন, উচ্চমাত্রার হর্নের শব্দ শিশুদের কানের সংবেদনশীল কোষ স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে, যার ফলে শেখার সক্ষমতা ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে স্থায়ী শ্রবণ প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকিও তৈরি হয়। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ধরনের শব্দদূষণ ঘুমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয় বলে জানান তারা।
পুলিশ প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে শব্দদূষণকারী যানবাহন শনাক্ত করা বেশ কঠিন একটি কাজ। তাই স্বয়ংক্রিয়ভাবে অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী গাড়ি শনাক্তের প্রযুক্তি নিয়ে ভাবছে ট্রাফিক পুলিশ। তিনি আরও জানান, অনেক সময় হর্ন খুলে নেওয়ার পরও চালকেরা তা আবার লাগিয়ে নেন, ফলে সার্বক্ষণিক নজরদারি ছাড়া এই সমস্যা সমাধান কঠিন। দীর্ঘ সময় তীব্র শব্দের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক ট্রাফিক পুলিশ সদস্যও শ্রবণশক্তি হ্রাস ও মাথাব্যথার সমস্যায় ভুগছেন, যে কারণে তাদের জন্য শ্রবণ সুরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা করছে পুলিশ প্রশাসন।
একজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞের মতে, শুধু আইনি কড়াকড়ি দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ম্যানুয়াল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে চালকদের মধ্যে অধৈর্য মনোভাব তৈরি হয়, যা অনবরত হর্ন বাজানোর প্রবণতাকে উসকে দেয়। তার পরামর্শ, আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি স্কুল ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো প্রয়োজন। সামগ্রিক এই চিত্র থেকে স্পষ্ট, শুধু নীরব এলাকা ঘোষণা বা আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়—এর কার্যকর প্রয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতা ছাড়া রাজধানীর শব্দদূষণ পরিস্থিতির প্রকৃত উন্নতি অসম্ভব।

