বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে বলে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো, জ্বালানি সরবরাহ সংকট এবং দীর্ঘদিনের সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে আগামী সময়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
এডিবি তাদের সর্বশেষ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুকে বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৯ শতাংশ করেছে। এর আগে জুলাই মাসে সংস্থাটি মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা দিয়েছিল।
এই পূর্বাভাসের সময় বাংলাদেশে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পথে রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।
এডিবির মতে, এসব কারণে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হয়ে উঠছে। সংস্থাটি বলছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উন্নয়নশীল ৪৩টি অর্থনীতির মধ্যে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি সবচেয়ে বেশি থাকা দেশগুলোর একটি হতে পারে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এই অঞ্চলে বাংলাদেশের চেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হতে পারে শুধু তুরস্ক, মিয়ানমার ও কাজাখস্তানে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ভারতের মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্ট মাসে দেশের পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, যা জুলাইয়ের ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কম। তবে এটি এখনো সরকারের নির্ধারিত ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে। সরকার ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে।
এর মধ্যে পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলের দাম ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটার ১৩৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব শুধু জ্বালানি স্টেশনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন ব্যয়, শিল্প খরচ এবং বাজারে পণ্য পৌঁছানোর ব্যয় বাড়ার মাধ্যমে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।
এডিবিও জানিয়েছে, বৈশ্বিক জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে আমদানি ব্যয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটিও সাম্প্রতিক বৈঠকে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এ ছাড়া সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো চালু হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের সামনে সহজ কোনো সমাধান নেই।
তার মতে, জ্বালানির দাম না বাড়ালে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হতো। সেই ক্ষতি ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে পূরণ করতে গেলে ব্যাংক খাতে চাপ বাড়ত, আবার সরকারি ভর্তুকি বাড়ালে বাজেটের ওপর অতিরিক্ত বোঝা তৈরি হতো।
অন্যদিকে, জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে না পারলে সরবরাহ সংকট তৈরি হতে পারে, যা আবার মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির সমস্যা শুধু আন্তর্জাতিক সংকটের কারণে তৈরি হয়নি। অভ্যন্তরীণ নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাও এর জন্য বড় কারণ।
তার মতে, কাগজে-কলমে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কঠোর মনে হলেও বাস্তবে বিভিন্ন তারল্য সহায়তা, পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা এবং অন্যান্য ব্যবস্থার কারণে এর প্রভাব অনেকটা কমে গেছে।
তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে যে নীতিকে কঠোর বলা হচ্ছে, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে সহায়ক বা সম্প্রসারণমূলক প্রভাব তৈরি করছে।
তিনি আরও বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, অনিয়ম, সরবরাহ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত খরচ এবং অনানুষ্ঠানিক ব্যয়ও পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
এডিবিও বলেছে, ধীরে ধীরে সহজ মুদ্রানীতি এবং বাজারে অতিরিক্ত তারল্য প্রবাহ মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে। তবে দুর্বল অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও ধীর ঋণ প্রবৃদ্ধি ভোক্তা চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমিয়ে রাখতে পারে।
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমিয়েছে এডিবি। সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করেছে।
এডিবির মতে, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, জ্বালানি সংকট, কাঠামোগত সমস্যা এবং বিনিয়োগের ধীরগতি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক ব্যালান্সশিট, বেশি ঋণ ব্যয় এবং ব্যাংকগুলোর সরকারি নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে ঝোঁকার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ সীমিত হচ্ছে।
এ ছাড়া অনিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন সমস্যা এবং দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়াও বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এডিবির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে দুর্বল চাহিদা এবং বিনিয়োগ অনিশ্চয়তা এর প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কৃষি খাতও আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব এবং সার সরবরাহের সীমাবদ্ধতার কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে সেবা খাত তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। প্রবাসী আয় এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা বাড়ার কারণে এই খাতে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে এডিবি।
এডিবির বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংফেং ঝাং বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে, তবে তা এখনো বৈশ্বিক ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
তিনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আর্থিক খাত, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ব্যবসার পরিবেশে দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা। জ্বালানি ব্যয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর নির্ভর করবে আগামী দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি।

