একসময় নির্মাণ কাজে অনিয়মের দায়ে পদাবনতি ও পদোন্নতি স্থগিতের মতো শাস্তি পাওয়া এক প্রকৌশলী এখন দুই হাজার পাঁচশ আটানব্বই কোটি টাকার একটি বৃহৎ পানি সরবরাহ প্রকল্পের পরিচালকের দায়িত্ব পেয়েছেন। খুলনার প্রকৌশল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচিত এই ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
আলোচিত এই প্রকৌশলীর নাম আরিফুল ইসলাম জুয়েল, যিনি প্রকৌশলীদের একটি রাজনৈতিক সংগঠনের খুলনা জেলা শাখার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সংযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বদলি হয়ে খুলনা ওয়াসায় উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে যোগ দেন। এরপর দুই দফায় প্রকল্প পরিচালক বদলের পর শেষ পর্যন্ত এই বড় পানি সরবরাহ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের দায়িত্বও তাঁর হাতে এসে পড়ে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর হাঁটাচলার সময় কম্পন অনুভূত হওয়ায় প্রায় এক দশক আগে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষকদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি ভবনের ছাদের একাধিক স্থানে পরীক্ষা চালিয়ে গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পায়। নকশায় নির্ধারিত কংক্রিটের পুরুত্বের তুলনায় বাস্তবে অনেক কম পুরুত্ব পাওয়া যায়, যা ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
তদন্তে আরও উঠে আসে, ছাদ ঢালাইয়ের সময় সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী দেশের বাইরে অবস্থান করছিলেন এবং ফিরে এসে নির্মাণকাজের প্রয়োজনীয় যাচাই না করেই সংশ্লিষ্ট নথিতে স্বাক্ষর করে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধে সহায়তা করেন। এই ঘটনায় মোট সাতজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়, যার মধ্যে তাঁকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে নামিয়ে দেওয়া হয় এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়।
জানা গেছে, প্রকৌশলীদের ওই সংগঠনের একজন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতার আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত তিনি, যিনি বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থার শীর্ষ পদে আছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে আগে দেওয়া শাস্তি বাতিল করে দেয়। এরপর তাঁকে উপ-প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে প্রেষণে পাঠানো হয় খুলনা ওয়াসায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে এভাবে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর ঘটনা এটিই প্রথম বলে জানা গেছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছ থেকেও তাঁর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। খুলনা মহানগর পর্যায়ের দলীয় নেতৃত্ব গত বছর কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেন, দলীয় পদ ব্যবহার করে তিনি বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, যা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে তাঁর সাংগঠনিক পদ বাতিলেরও সুপারিশ করা হয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে আগে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে তাঁর প্রাপ্য মূল্যায়ন করা হয়েছে মাত্র।
কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত না হওয়া নিয়েও একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন তিনি। ডিজিটাল হাজিরার তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট একটি সময়ে টানা চার মাসের মধ্যে প্রতিটি কর্মদিবসেই তিনি দেরিতে অফিসে প্রবেশ করেছেন এবং অধিকাংশ দিন নির্ধারিত সময়ের আগেই কার্যালয় ত্যাগ করেছেন—গড়ে দৈনিক তিন ঘণ্টারও কম সময় অফিসে ছিলেন বলে রেকর্ডে উঠে এসেছে। এ নিয়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে তাঁকে ফের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। খুলনা ওয়াসায় যোগদানের পরও নিয়মিত কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহৎ পানি সরবরাহ প্রকল্পের রুটিন দায়িত্বে থাকা একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে গত এপ্রিলে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, সাংগঠনিক প্রভাব খাটিয়ে এই রদবদলের পেছনে মূল ভূমিকা ছিল আলোচিত সেই প্রকৌশলীর। এরপর জুনের শেষে ওয়াসায় যোগ দিয়ে তিনি নিজেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পাওয়ার চেষ্টা শুরু করেন বলে সূত্রের দাবি। তবে জুলাইয়ে সাময়িকভাবে ওই দায়িত্ব দেওয়া হয় সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। পরবর্তীতে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ ও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে তদবিরের মাধ্যমে তাঁকেও দায়িত্ব থেকে সরানোর চেষ্টা করা হয়, এবং শেষ পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব বর্তায় আলোচিত সেই প্রকৌশলীর ওপর।
এ বিষয়ে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য করেছেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারভুক্ত, এ ব্যাপারে তাঁর কিছু বলার নেই।
স্থানীয় একটি নাগরিক সংগঠনের এক দায়িত্বশীল সদস্য মন্তব্য করেছেন, সুপেয় পানি সরবরাহে ব্যর্থতা, বিল সংক্রান্ত ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়ির মতো নানা সমস্যায় জর্জরিত প্রতিষ্ঠানটিকে সচল রাখতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা প্রয়োজন। তাঁর আশঙ্কা, অতীতে শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যদি রাজনৈতিক বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা পান, তাহলে প্রতিষ্ঠানের সার্বিক পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর পূর্বের বক্তব্যের বাইরে নতুন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি, এবং তাঁর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়া বা পূর্বের শাস্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা মেলেনি।

