স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরে একসময় দাপুটে এক সিন্ডিকেট পরিচালনা করত পাঁচ প্রভাবশালী কর্মকর্তা। এ সিন্ডিকেট তাদের একচ্ছত্র প্রভাব খাটিয়ে দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে এই সিন্ডিকেট একটি অবাধ বাণিজ্য চালিয়েছে। পুলিশ, র্যাব, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর ছিল তাদের অর্থ সংগ্রহের মূল কেন্দ্র।
দুর্নীতি ও ক্ষমতার দাপট-
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সূত্রে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটের পাঁচ সদস্য হলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব ড. হারুন অর রশীদ বিশ্বাস, যুগ্ম সচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস, জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু, সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মনির হোসেন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোল্লা ইব্রাহিম হোসেন। এরা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেন এবং তাদের কথার বাইরে কিছুই ঘটত না।
তাদের অবাধ ক্ষমতার নজির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন নিয়োগ ও বদলির ঘটনায় পাওয়া যায়। অভিযোগ রয়েছে, পুলিশের ডিআইজি মোল্ল্যা নজরুল ইসলামকে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার পদে নিয়োগ দিতে ৫ কোটি টাকার চেক ও নগদ ২ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় প্রায় দেড়শ কাউন্সিলর প্রার্থীর কাছ থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
সম্পদের পাহাড় ও বিদেশে অর্থপাচার-
দুদকের অনুসন্ধানে এই পাঁচ কর্মকর্তার নামে-বেনামে বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা তাদের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। সাবেক এপিএস মনির হোসেনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। বাকি চারজনের বিরুদ্ধেও মামলা প্রক্রিয়াধীন।
দুদক জানিয়েছে, এই সিন্ডিকেট এনজিওগুলোর নো অবজেকশন সার্টিফিকেট (এনওসি) দিতে প্রতি সংস্থা থেকে ৮০ লাখ থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিত। এমনকি ফায়ার সার্ভিসের নিয়োগেও তারা মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করেছে।
ক্ষমতার অপব্যবহার-
এই সিন্ডিকেট পুলিশের নিয়োগ, বদলি এবং চার্জশিট থেকে আসামি অব্যাহতি দেওয়ার মতো স্পর্শকাতর কাজেও মোটা অঙ্কের ঘুষ আদায় করত। বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার পদায়নে তাদের চাহিদামতো অর্থ না দিলে পদায়ন সম্ভব হতো না। ২০২২ সালে ডিআইজি মোল্ল্যা নজরুলকে গাজীপুরে পদায়নের ঘটনা সচিবালয়ে আলোড়ন তোলে।
বর্তমান অবস্থা-
২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পরিবর্তনের পর এই সিন্ডিকেট কার্যত ভেঙে পড়ে। সদস্যদের অনেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অপসারিত হয়েছেন। প্রভাবশালী ড. হারুন অর রশীদ অবসরে গেলেও মন্ত্রণালয়ে তার নিয়মিত যাতায়াত ও প্রভাব ছিল। বর্তমানে দুদক তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড শুধু আর্থিক দুর্নীতিই নয়, প্রশাসনিক দুর্বলতাকেও প্রকটভাবে প্রকাশ করে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি অবশ্যম্ভাবী। দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু রাখতে এ বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

