রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের (সিআইআইডি) অভিযানে দুবাই, মালয়েশিয়া ও চীনের গুয়াংজু থেকে আসা চার যাত্রীর কাছ থেকে ২২৩ কার্টুন বিদেশি সিগারেট, ৪৪টি ভেপ এবং ১৪৪টি মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে জব্দ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জব্দকৃত পণ্যের আনুমানিক বাজারমূল্য ১৭ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ‘গোপন সংবাদের’ ভিত্তিতে বিমানবন্দরের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত সার্কেলের বি-শিফট সন্দেহভাজন যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করে। সেই নজরদারির মধ্যেই একই দিনে তিনটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট থেকে এই বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ পণ্য আটক করা হয়।
প্রথম অভিযানটি চালানো হয় দুবাই থেকে আসা এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ইকে-৫৮৪-এর যাত্রী আব্দুল করিমের বিরুদ্ধে। তিনি গ্রিন চ্যানেল বা সবুজ চ্যানেল দিয়ে পার হওয়ার সময় তার চলাচল সন্দেহজনক মনে হলে কাস্টমস কর্মকর্তারা তাকে থামান এবং তার ব্যাগেজ তল্লাশি করেন; তল্লাশিতে তার ব্যাগ থেকে ২২৩ কার্টুন বিদেশি সিগারেট উদ্ধার হয়। ‘সবুজ চ্যানেল’ হলো বিমানবন্দরে সেই পথ, যেখানে যাত্রীরা ঘোষণা করেন যে তাদের কাছে কোনো শুল্কযোগ্য বা নিষিদ্ধ পণ্য নেই। কেউ যদি এই চ্যানেল ব্যবহার করে নিষিদ্ধ পণ্য বহন করেন, তাহলে সেটি সরাসরি শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালানের শামিল। আব্দুল করিমের ক্ষেত্রে ঠিক সেটিই ঘটেছে বলে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের অভিযোগ।
একই দিনে মালয়েশিয়া থেকে আসা এয়ারএশিয়ার ফ্লাইট একে-৭১-এর যাত্রী শেপনের ব্যাগেজ তল্লাশি করে ৪৪টি ভেপ জব্দ করা হয়। বাংলাদেশে ই-সিগারেট বা ভেপ ব্যবহার ও আমদানি নিষিদ্ধ। এর আগে ২০১৯ সালে ই-সিগারেট নিষিদ্ধ করার প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ফলে ভেপ আমদানি, বিক্রি বা পরিবহন, সবই আইনত অপরাধ। কিন্তু বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য বলছে, প্রতিনিয়তই বিভিন্ন রুট থেকে ভেপ ও ই-লিকুইড ঢুকছে চোরাচালানের মাধ্যমে।
তৃতীয় অভিযানটি চালানো হয় চীনের গুয়াংজু থেকে আসা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বিএস-৩২৬-এর যাত্রী কে এম তোফায়েল আহমেদ ও শামিমা আক্তারের বিরুদ্ধে। কাস্টমস কর্মকর্তারা তোফায়েলের কাছ থেকে ৯৮টি এবং শামিমা আক্তারের কাছ থেকে ৪৬টি মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে জব্দ করেন, মোট ১৪৪টি। মোবাইল ফোনের ডিসপ্লে বা স্ক্রিন সাধারণত চোরাচালানের মাধ্যমে আসে, কারণ এগুলোতে উচ্চ শুল্ক দিতে হয়। বৈধভাবে আমদানি করলে প্রতি ডিসপ্লের ওপর বিপুল পরিমাণ শুল্ক ও কর দিতে হয়, যা চোরাচালানকারীদের জন্য লাভজনক করে তোলে।
কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, একই দিনে তিনটি ভিন্ন আন্তর্জাতিক রুট থেকে একই ধরনের নিষিদ্ধ পণ্য আটক হওয়াটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং তদন্ত করছেন; এই যাত্রীরা শুধু ‘ক্যারিয়ার’ বা পাচারকারী হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছেন কি না এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত আছে কি না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে সিগারেট, ভেপ, মোবাইল ডিসপ্লে, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ পণ্য ঢুকছে বছরের পর বছর ধরে। এসব চালানের পেছনে সাধারণত বিমানবন্দরের ভেতরে ও বাইরে যোগসাজশকারী একটি নেটওয়ার্ক কাজ করে, যা যাত্রীদের ব্যবহার করে পণ্য পরিবহন করে। তদন্তে যদি এই যোগসাজশের প্রমাণ মেলে, তাহলে শুধু যাত্রীরা নন, চক্রের মূল হোতাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে বিদেশি সিগারেট ও মোবাইল ফোনের ডিসপ্লের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপিত। বৈধভাবে আমদানি করলে প্রতি প্যাকেট সিগারেটে ৬০ শতাংশের বেশি সম্পূরক শুল্ক দিতে হয়, আর মোবাইল ডিসপ্লের ওপর শুল্ক ৩২ শতাংশ পর্যন্ত। এই উচ্চ শুল্কের কারণেই চোরাচালানকারীদের জন্য এটি লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে। একটি কার্টুন সিগারেটের বৈধ মূল্য যেখানে কয়েক হাজার টাকা, সেখানে চোরাচালানের মাধ্যমে তা অর্ধেক দামে বাজারে ছাড়া হয়। একইভাবে মোবাইল ডিসপ্লেও বৈধ আমদানির তুলনায় চোরাচালানে ৩০-৪০ শতাংশ কম খরচ পড়ে। প্রশ্ন হলো, এই চোরাচালান বন্ধে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে? কাস্টমসের নিয়মিত অভিযান চললেও চোরাচালানকারীরা নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এবারের ঘটনায় একই দিনে তিন রুট থেকে পণ্য আসা প্রমাণ করে, চক্রটি সুসংগঠিত এবং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা বেশ শক্তিশালী। কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগ বলছে, তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

