কুষ্টিয়া আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে বর্তমানে চলছে বিশেষ প্যাকেজ সিস্টেমের মাধ্যমে সব কাজ। যেখানে অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাহিদামতো অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎগতিতে কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও, কেউ যদি প্যাকেজে রাজি না হন, তবে তাদের জন্য ব্যাপক হয়রানি অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট থেকে ই-পাসপোর্টে নামের বানান ও জন্মতারিখ সংশোধনের জন্য পাসপোর্ট অফিসে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের বিড়ম্বনা সবচেয়ে বেশি। অভিযোগ উঠেছে, এখানে দালালদের মাধ্যমে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরেও সাধারণ আবেদনকারীরা নানা সমস্যা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কুষ্টিয়া পাসপোর্ট অফিসের কতিপয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং স্থানীয় দালালরা মিলে একটি সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন, যেখানে আবেদনকারীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
অফিসের রেকর্ডকিপার হাসানুজ্জামান, হিসাবরক্ষক মাহফুজ্জামান, ডেটা এন্ট্রি কন্ট্রোল অপারেটর ফারুক হোসেন, অফিস সহকারী হাফিজুর রহমান, নাইট গার্ড রমেশ, মালী রাসেল আহম্মদ ও ওয়াসিমসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা এ চক্রে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি, পাসপোর্ট অফিসের সামনে থাকা কয়েকটি টেলিকম দোকানও এ চক্রের অংশ।
এ বিষয়ে এক দালাল জানান, ‘‘এখানে দুই সিস্টেমে কাজ হয়: এক হল নরমাল আবেদন এবং অন্যটি প্যাকেজ সিস্টেম। প্যাকেজ সিস্টেমে এলে আমরা অফিসের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সব কিছু ঠিক করে দেব। এতে আপনার কোনো ঝামেলা হবে না।’’
প্যাকেজ সিস্টেমে আবেদন করতে হলে, সাধারণত আবেদনকারীদের কাছ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়, যার মধ্যে পাসপোর্ট তৈরির সরকারি খরচ ৫ হাজার ৮০০ টাকার মানি রিসিট পাওয়া যায়। বাকি অর্থ চলে যায় অফিসের কর্মকর্তাদের পকেটে। একাধিক আবেদনকারী জানিয়েছেন, দালালের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার পর তাদের কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়, তবে সাধারণভাবে গেলে নানা অজুহাতে হয়রানির শিকার হতে হয়।
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পোড়াদহ এলাকার মিরাজুল ইসলাম নতুন পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। তিনি জানান, প্রথমে দালাল ধরে না আসায় তার আবেদন প্রায় এক মাস ফেলে রাখা হয়। এরপর দেড় হাজার টাকা দিলে অফিসের এক কর্মচারী তার আবেদনটি নিয়ে কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে আরও আড়াই হাজার টাকা খরচ করে তিনি পাসপোর্ট পেয়ে যান।
পাসপোর্ট অফিসের সামনে থাকা টেলিকম দোকানগুলো মূলত এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রস্থল হিসেবে কাজ করছে। সেখানে গিয়ে আবেদনকারীরা তাদের পছন্দের সিস্টেম অনুযায়ী পরামর্শ নিতে পারেন এবং এরপর ওই টেলিকম দোকানে মোবাইলে আবেদনপত্রের প্রথম পাতা পাঠানো হয়। প্রতি দিন শতাধিক আবেদন এই প্রক্রিয়ায় যায় এবং এর জন্য প্রতিটি আবেদন থেকে আদায় করা হয় হাজার থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ চক্রের নেতৃত্বে রয়েছেন রেকর্ডকিপার হাসানুজ্জামান, যিনি প্রতিদিন অন্তত ১০০-১৫০ আবেদন সংগ্রহ করে রাতেই অর্থ ভাগাভাগি করে থাকেন।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক আব্দুর রহমান বলেন- ‘‘আমি নতুন এসেছি, বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি অভিযোগ সত্য হয়, তবে আমি অবশ্যই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’’ তবে, কোনো ধরনের হয়রানি বা অপকর্মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রেকর্ডকিপার হাসানুজ্জামান। তিনি দাবি করেছেন, ‘‘অফিসের কেউ টাকাপয়সা নেয় কিনা আমি জানি না। যদি কেউ নেয়, তবে তা তার ব্যক্তিগত দায়িত্ব।’’
অপরদিকে পুলিশের গোপন শাখার এক কর্মকর্তা জানান- ‘‘পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা যাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন, তাদের আবেদনই তদন্তের আওতায় আসে। অনেক সময় ছোটখাটো সংশোধনও পুনরায় তদন্তের জন্য জমা দেওয়া হয়, যা সহকারী পরিচালক বা অন্য কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে।’’
এ বিষয়ে সায়মা টেলিকমের মালিক মহিবুল ইসলাম বলেন- ‘‘আবেদনকারীরা আমাদের কাছে এসে সাহায্য চান, আর আমরা তাদের যথাসম্ভব সহযোগিতা করি। আমাদের অফিসের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে এবং মাঝে মধ্যে আমরা সহযোগিতার জন্য তাদের কাছে যাই।’’
এই চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে সেবাপ্রত্যাশীদের প্রতি এ ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

