চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের একটি প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে বড় ধরনের একটি চোরাচালান জালিয়াতির ঘটনা সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রায় দেড় বছর আগেই বন্ধ হয়ে গেছে এবং এর আমদানি অনুমোদনও বাতিল, তারপরও প্রতিষ্ঠানটির পুরোনো নাম ব্যবহার করে কাপড়ের রোলের ভেতরে হংকং থেকে ঢাকায় আনা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৬৫৫টি মোবাইল ফোন, যার আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ কোটি টাকা।
রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হয়ে যাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি পরে নিলামেও বিক্রি হয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া সাধারণত এই অঞ্চল থেকে কোনো পণ্য খালাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু এই চালান খালাসের জন্য একই এলাকার আরও দুটি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো পরিচিতি নম্বর অবৈধভাবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই অনিয়ম খুঁজতে গিয়েই একের পর এক চমকপ্রদ তথ্য সামনে আসতে থাকে, এবং পুরো ঘটনার সঙ্গে একটি সিএন্ডএফ এজেন্সির নাম জড়িয়ে পড়ে। ওই এজেন্সির পক্ষ থেকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করা হলেও ক্যামেরার সামনে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
চট্টগ্রামে ওই সিএন্ডএফ এজেন্সির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় তিন বছর আগেই আগ্রাবাদের এই অফিসটি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তবে বাড়িভাড়া বা বিদ্যুৎ বিল কোনোটাই পরিশোধ করা হয়নি। ভবনের মালিক জানান, প্রতিষ্ঠানটি চলে যাওয়ার পর বিদ্যুতের মিটার বিল তাদেরই নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়েছে।
জালিয়াতির প্রক্রিয়ায় আরও একটি ধাপ উঠে এসেছে—বন্ধ হয়ে যাওয়া সেই প্রতিষ্ঠানের নামে নকল চিঠির প্যাড তৈরি করে, এক ব্যক্তি নিজেকে সেই প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল ম্যানেজার হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এই কাজে তার সহযোগী হিসেবে আরেকজন ব্যক্তিও যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।
সিএন্ডএফ এজেন্সিটির স্বত্বাধিকারী দাবি করেন, তাকে সরাসরি ফোন করা হয়নি, বরং তার একজন কর্মচারীকে কল করা হয়েছিল বলে তিনি জেনেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন বিভাগ থেকে নিয়মিতভাবেই এলোমেলোভাবে ফোন আসে, এবং এই সংশ্লিষ্ট চালানটি সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে ছাড় হয়েছিল।
অন্যদিকে বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তাকে বিপদে ফেলার জন্য কেউ ষড়যন্ত্র করছে বলে তার ধারণা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে যে চিঠির প্যাড ব্যবহার করা হয়েছে, তা আসল নয়—সম্পূর্ণ নকল। তিনি জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি সিএন্ডএফ এজেন্সিটির মালিক হলেও তিনি কখনো তাদের প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল ম্যানেজার পদে ছিলেন না, এবং সেই নামে কেউ কখনো তার প্রতিষ্ঠানে কাজও করেননি। তিনি আরও বলেন, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তার একাধিক মামলা চলমান রয়েছে, এবং এই ঘটনা তাকে হয়রানি বা বেকায়দায় ফেলার একটি প্রচেষ্টা হতে পারে বলে তার সন্দেহ।
এই ঘটনায় শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ মামলা করেছে। চলতি মাসের ৮ তারিখে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকা থেকে এই চালানটি আটক করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচিতি নম্বর ব্যবহার করে এ ধরনের চোরাচালানের ঘটনা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় গুরুতর দুর্বলতার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। বন্ধ বা নিলামে বিক্রি হওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য কীভাবে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকল এবং কীভাবে তা ব্যবহার করে পণ্য খালাস সম্ভব হলো, তা খতিয়ে দেখা এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

