বৈশ্বিক লিঙ্গসমতা সূচকে এক বছরের ব্যবধানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ২০২৬ সালের বৈশ্বিক লিঙ্গ বৈষম্য সূচকে বাংলাদেশ ৫৫ ধাপ পিছিয়ে ৭৯তম অবস্থানে নেমে এসেছে। ১৪৫টি দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে অবস্থানের অবনতি হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় এখনো লিঙ্গসমতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। টানা ১২ বছর ধরে এই অঞ্চলে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে দেশটি।
২০২৬ সালের সূচক প্রকাশের আগে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে দেশটি ৯৯তম অবস্থান থেকে উঠে ২৪তম স্থানে পৌঁছেছিল, যা ছিল সূচকের ইতিহাসে অন্যতম বড় উন্নতি। কিন্তু এবার সেই অগ্রগতির একটি বড় অংশ হারিয়েছে বাংলাদেশ।
নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে মোট লিঙ্গ ব্যবধানের ৭১ দশমিক ২ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর এই হার ছিল ৭৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অগ্রগতির হার কমেছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট।
এই পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতাকে। এই খাতে বাংলাদেশের অবস্থান ২১ দশমিক ২ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশিষ্ট ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নারীর উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী ছিল। প্রধানমন্ত্রী, সংসদ স্পিকার এবং সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তবে ২০২৬ সালের সূচকে ব্যবহৃত তথ্য অনুযায়ী, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ আগের তুলনায় কমেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এই সূচকে চারটি প্রধান বিষয় বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষাগত অর্জন, স্বাস্থ্য ও টিকে থাকা এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। মোট ১৪টি সূচকের মাধ্যমে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে নারী ও পুরুষের সুযোগের পার্থক্য বিশ্লেষণ করা হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র এখনো অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ। ২০২৬ সালে এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মোট ব্যবধানের ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ কমাতে পেরেছে, যা গত বছরের ৪৫ দশমিক ৭ শতাংশের তুলনায় কম।
বিশেষ করে আয়, শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্মক্ষেত্রে নারীর উপস্থিতির ক্ষেত্রে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। আনুমানিক আয় সমতার ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট, শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণে ৫ দশমিক ৭ শতাংশ পয়েন্ট এবং নেতৃত্ব পর্যায়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট অবনতি হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে ১২তম অবস্থানে রয়েছে। এই খাতে বাংলাদেশের সমতা অর্জনের হার ৫০ দশমিক ৯ শতাংশ। গত বছর এই অবস্থান ছিল তৃতীয়। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সমতার হার নেমে এসেছে ২ দশমিক ৪ শতাংশে, যা পরিমাপের সময়কালের সর্বনিম্ন পর্যায়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি অব্যাহত রয়েছে। রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নারীর প্রতিনিধিত্বের সূচকে ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ পূর্ণ সমতা ধরে রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪৫টি দেশের মধ্যে ৬৪টি দেশে এই সময়ে কোনো নারী রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না। বাংলাদেশ ও আইসল্যান্ড এই ক্ষেত্রে সমতা অর্জন করেছে।
স্বাস্থ্য ও টিকে থাকার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সমতার হার ৯৬ শতাংশ রয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ধরে রেখেছে। শিক্ষাগত অর্জনের ক্ষেত্রে সমতার হার ৯৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত দুই দশকের ধারাবাহিক উন্নতির ফল।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের অংশগ্রহণে বাংলাদেশ প্রায় সমতা অর্জন করেছে। তবে উচ্চশিক্ষায় এখনো বড় ব্যবধান রয়েছে। এই পর্যায়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবধান ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ।
দক্ষিণ এশিয়ার চিত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ২০২৬ সালে পুরো দক্ষিণ এশিয়া লিঙ্গ ব্যবধানের ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমাতে পেরেছে। তবে অঞ্চলটি বিশ্বের আটটি অঞ্চলের মধ্যে সপ্তম অবস্থানে রয়েছে।
গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমান গতিতে এগোলে দক্ষিণ এশিয়ায় সম্পূর্ণ লিঙ্গ সমতা অর্জনে আরও প্রায় ১৪৯ বছর সময় লাগতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা নিজেদের অবস্থানের উন্নতি করেছে। ভুটানের অবস্থান কিছুটা নেমেছে, আর ভারতের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি।
বাংলাদেশ ১২তম বছরের মতো এবারও দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে রয়েছে। বৈশ্বিক তালিকায় মালদ্বীপ ১১৯তম, নেপাল ১২০তম, ভুটান ১২১তম, শ্রীলঙ্কা ১২৯তম এবং ভারত ১৩১তম অবস্থানে রয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশ পাকিস্তান। দেশটি মোট লিঙ্গ ব্যবধানের ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ কমাতে পেরেছে এবং ২০২৫ সালের তুলনায় পাঁচ ধাপ উন্নতি করেছে।
বিশ্বব্যাপী লিঙ্গসমতায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে আইসল্যান্ড। দেশটি টানা ১৭তম বছরের মতো শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটি মোট লিঙ্গ ব্যবধানের ৯৩ শতাংশ কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং একমাত্র দেশ হিসেবে ৯০ শতাংশের বেশি সমতা অর্জন করেছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ফিনল্যান্ড ও নরওয়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়ানো। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্জন ধরে রাখার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্র, নেতৃত্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে ভবিষ্যতে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান আবারও উন্নতির দিকে যেতে পারে।

