সরকারি মার্চেন্ট ব্যাংক ‘জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’-এর বর্তমান সিই শহীদুল হককে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ২০২০ সালের শেষের দিকে, জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বিধি লঙ্ঘন করে শহীদুল হককে এই পদে নিয়োগ দেন। তার নিয়োগের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনায় জড়িয়ে পড়েছে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল বেক্সিমকো শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে ৪৭৭ কোটি টাকা অবৈধ মুনাফা তুলে নেওয়া। এই ঘটনায় জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লি. (জেসিআইএল) কে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।
নিয়োগের সময় শর্তাবলী অনুযায়ী শহীদুল হকের পেশাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কম ছিল, তবুও তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। জনতা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ড. এসএম মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের আত্মীয়কে নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকের নিয়মনীতি ও শর্তগুলো অগ্রাহ্য করেছেন। এছাড়া, তিনি বেক্সিমকো এবং এস আলম গ্রুপকে ঋণের নামে সুবিধা প্রদান করে জনতা ব্যাংককে আর্থিকভাবে দুর্বল করে দিয়েছেন, যার ফলে ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের ৬১ শতাংশ এখন খেলাপি হয়ে পড়েছে।
২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর, জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকায় জেসিআইএলের সিই নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে প্রার্থীর জন্য নির্দিষ্ট শর্ত ছিল: ৩-৪ বছরের স্নাতকসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, পেশাগত অভিজ্ঞতা ১৫ বছর এবং মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা। তবে শহীদুল হক, যিনি স্নাতক (পাশ) তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ ছিলেন এবং মার্চেন্ট ব্যাংকিংয়ে পুরো ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও, তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
জানা গেছে, জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২০২০ সালের ৬৩৭তম সভায় শহীদুল হকসহ তিনজন প্রার্থীকে সাক্ষাৎকারের জন্য নির্বাচন করে। তবে, তিনজন প্রার্থীর মধ্যে শহীদুল হকের যোগ্যতা সবচেয়ে কম ছিল, তবুও তাকে সিই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, তৃতীয় শ্রেণির ডিগ্রিপ্রাপ্তদের অযোগ্য মনে করা হয়, কিন্তু শহীদুল হক তৃতীয় শ্রেণির ডিগ্রিধারী ছিলেন।
এ বিষয়ে শহীদুল হক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, তার নিয়োগে সব নিয়ম মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে, জনতা ব্যাংকের হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট বর্তমানে এ নিয়োগের বিষয়ে তদন্ত করছে। এর আগে, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এবং জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারক এ বিষয়ে বলেন, “এটি একটি গুরুতর বিষয়, এবং আমি নিশ্চিতভাবে এটি দেখব। যদি বোর্ড কোনো নিয়ম ভেঙে থাকে, তবে আমি তা খতিয়ে দেখব।” জনতা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মুহ: ফজলুর রহমানও জানিয়েছেন, তিনি বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেছেন এবং সহযোগিতা পেলে তা বাস্তবায়ন করবেন।
২০২১-২০২২ সালে, শহীদুল হকের নেতৃত্বে বেক্সিমকো শেয়ার কারসাজির মাধ্যমে ৪৭৭ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা সামনে আসে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই ঘটনায় জড়িত চার ব্যক্তি এবং পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪২৮ কোটি টাকার বেশি জরিমানা করেছে।
এছাড়া, জনতা ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান জনতা ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেডের সিই হিসেবে শহীদুল হকের বেতনও তর্কের সৃষ্টি করেছে। জানা গেছে, তার মাসিক আর্থিক সুবিধা প্রায় চার লাখ টাকা, যা জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) চেয়ে বেশি। ২০২৩ সালে শহীদুল হক বেতন, ভাতা এবং বোনাসসহ প্রায় ২৪ লাখ টাকা গ্রহণ করেছেন। এই ধরনের আর্থিক সুবিধা ও প্রভাবশালী পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, জনতা ব্যাংকের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে চুক্তিভিত্তিক সিইও নিয়োগের পাশাপাশি যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন না করা হলে, এতে শুধু প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম ব্যাহত হবে না বরং সরকারি খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সুনামও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

