অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর গুলশান-১ এর ১৫ নং রোডের আবাসিক ভবন র্যাংগস ওয়াটারফ্রন্টে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স পুনঃনির্ধারনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয় ভবনের ফ্ল্যাট মালিকদের।
এ সময় সিটি কর্পোরেশনের রেভিনিউ সুপারভাইজার মেহেদী হাসান রিছাদ প্রত্যেক ফ্ল্যাট মালিকের কাছে ২ লাখ করে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন এবং ফ্ল্যাট মালিকদের আশ্বস্ত করেন, তাদের ট্যাক্স যা আসবে- তার থেকে অনেক কমিয়ে দেওয়া হবে।
ওই ভবনের ৬২টি ফ্লাটের মধ্যে একটির মালিক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ। তিনিও সেদিন অন্যান্য মলিকদের সঙ্গে ওই আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন।
আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন, “আমার ফ্লাটের হোল্ডিং ট্যাক্স আমি বিগত বছরগুলোতে প্রতি বছর ৩৫ হাজার টাকা দিয়ে আসছি। এখন যদি নতুন করে মূল্যায়ন করে, সেক্ষেত্রে ট্যাক্স বাড়লেও সেটা দিতে আমি রাজি আছি। কিন্তু অসুদপায় অবলম্বন করে ট্যাক্স কমানোর পক্ষে আমি নই। ওই কর্মকর্তাকে যদি ঘুষ না দেওয়া হয় তাহলে বর্তমানে যে টাকা দিচ্ছি, তার থেকে ২-৩গুণ ট্যাক্স বাড়িয়ে দেবেন বলেও হুমকি দিয়েছেন। এছাড়া নানান জটিলতার বিষয়ে ফ্ল্যাট মালিকদের ভয় দেখানো হয়েছে।”

এমন অভিযোগের ভিত্তিতে রেভিনিউ সুপারভাইজর রিছাদের গতিবিধির ওপর গভীর তদন্ত চালিয়েছে এবং প্রমাণ পেয়েছে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো শুধু ফ্ল্যাটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; আরও বিভিন্ন জায়গায় তিনি এ ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, রেভিনিউ সুপারভাইজার মেহেদী হাসান রিছাদের আওতায় গুলশানে প্রায় ২ হাজার হোল্ডিং এ এমন নোটিশ তিনি পাঠিয়েছেন এবং পর্যায়ক্রমে তাদের থেকেও ২, ৫, ১০ লাখ করে টাকা ঘুষ চাচ্ছেন।
শুধু মেহেদী হাসান রিছাদই গুলশান, বারিধারা, বনানীর প্রায় ২,০০০ হোল্ডিং থেকে অন্তত ৪০ কোটি টাকা ঘুষ বাণিজ্য করতে চাচ্ছেন। এক্ষেত্রে ঘুষদাতা এবং গ্রহীতা উভয়ই এ ধরনের লেনদেন থেকে উপকৃত হন বিধায়, এসব ঘটনা তেমন প্রকাশ্যে আসতে দেখা যায় না।
বিষয়টি শিকারও করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাবেক এক প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টিবিএসকে তিনি জানান, জোন-৩ এ ৮ জন রেভিনিউ সুপারভাইজর রয়েছেন, যারা করদাতাদের কাছ থেকে ঘুষ আদায়ের জন্য প্ররোচিত করতে, এমনকি চাপ দিতে মধ্যস্থতাকারীদের সাহায্য নেন।
তিনি বলেন, “ট্যাক্সের এমন কাজ করতে সিটি কর্পোরেশনে একটি চক্র কাজ করে। আমি নিজেও এই চক্রের বিরুদ্ধে চেষ্টা করেছি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারিনি।”
র্যাংগস ওয়াটারফ্রন্টের ফ্ল্যাট মালিকদের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে আনা ঘুষের অভিযোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, রিছাদ তা ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন’ বলে অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, “আমরা এ ধরনের দুর্নীতি কখনও বরদাস্ত করবো না। আমরা এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। আর আমরা শুধু একজনকেই নয়, এভাবে অনিয়ম করে আসা যদি কোনো চক্র থাকে, সেটিকেও শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসবো।”
এ বিষয়ে অঞ্চল-৩ এর কর কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, “বার্ষিক কর মূল্যায়নের চিঠি যাচ্ছে গুলশান এলাকায় এটা ঠিক, কিন্তু ঘুষ দাবি করার বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি।”
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর সভাপতি ড. আদিল মোহাম্মদ খান টিবিএসকে, “দেশের এত বড় একটি পরিবর্তন হলেও সিটি কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে দুর্নীতিবাজ আগের লোকেরাই রয়ে গেছেন। সিটি কর্পোরেশনের এমন ঘটনা হতাশাজনক, এতে নগরবাসী বৈধ পথে না গিয়ে অসৎ চক্রের সাথে জড়িয়ে যাবে। এতে নগর ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
ঢাকা উত্তরের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিন টিবিএসকে বলেন, “রেভিনিউ বিভাগে অনেক জায়গায়ই সমস্যা আছে এবং বিভিন্ন সময় অভিযোগও আসে। এর আগেও কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে এই সুপারভাইজারের এমন অভিযোগ আমরা পাইনি।এমন অভিযোগ পেলে আমাদের সংস্কারপন্থীরা ব্যবস্থা নেবেন বলে আশা করি। আর এক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও সচেতন হওয়া জরুরি।” সূত্র : টিবিএস

