মা ইলিশ রক্ষায় সরকারিভাবে মাছ ধরা, পরিবহন ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বরিশালের মেঘনা নদীতে এখন স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি জাল ফেলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে হিজলা উপজেলা বিএনপির দুই নেতার বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ এসেছে। তাঁরা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে জাল ফেলে ইলিশ ধরা হচ্ছে, সেটি তাঁরা অস্বীকার করেননি। জেলে, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরাও বলছেন, বাজারে ইলিশ আসছে এবং বিক্রি হচ্ছে, তবে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম দামে।
সরকার ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ২২ দিন ইলিশ ধরা, বিক্রি, পরিবহন ও বাজারজাত করা নিষিদ্ধ করেছে। এ সময় ইলিশের প্রজনন মৌসুম। অভিযোগ আছে, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শুধু মেঘনা নয়, জেলার সব নদীতেই জেলেরা মা ইলিশ শিকারে নেমেছেন। অভিযান চালালে কিছুক্ষণের জন্য তাঁরা সরে যান, পরে আবার ফিরে আসেন। অনেক ক্ষেত্রে সংঘবদ্ধ হয়ে সশস্ত্র অবস্থায় অভিযানকারী দলের ওপর হামলার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নিষেধাজ্ঞার পাঁচ দিনেই মৎস্য অধিদপ্তর, নৌ-পুলিশসহ প্রশাসনের নাভিশ্বাস উঠেছে। হামলাকারী জেলেদের নিবৃত্ত করতে পাঁচ দিনে কোস্টগার্ড ১১টি ফাঁকা গুলি ছুড়েছে। হামলায় হিজলা উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তরের একটি স্পিডবোটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হিজলা উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, স্বাভাবিক মৌসুমের চেয়ে এখন মেঘনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি জাল ফেলছেন জেলেরা। অভিযান চালিয়ে ধাওয়া দিলে তাঁরা সরে যান। তাঁর ভাষ্য, জাল তুলতে গেলে ১০ থেকে ১২টি নৌকা সশস্ত্র অবস্থায় হামলা করে। প্রতিদিনই জেলেরা ভয়ংকর আচরণ করছেন। এসবের পেছনে কারা আছেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবকিছু বুঝলেও বলা যাচ্ছে না। তবু যতটুকু রক্ষা করা যায়, সে চেষ্টা চলছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলম জানান, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানিতে ডিম ছাড়ে। সাগর থেকে উঠে এসে সেই পানি পায় মেঘনার মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া থেকে হিজলা পর্যন্ত অংশে। এ অংশে ১০ থেকে ১২টি নদীর মুখ থাকায় গভীরতা বেশি, কোনো চর নেই। তাই প্রজনন মৌসুমে প্রচুর ইলিশ এখানে আসে। তিনি বলেন, গত বছর কঠোর অভিযানের কারণে এ বছর ইলিশের পরিমাণ ও আকার দুটিই বেড়েছে। কিন্তু সংঘবদ্ধ জেলেদের কারণে মা ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না। উলানিয়া থেকে অন্তত ৬০ কিলোমিটার এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মাছ শিকার বন্ধ করা না গেলে নিষেধাজ্ঞার কোনো ফল মিলবে না। ভবিষ্যতে ইলিশ আরও কমে যাবে বলে তিনি আশঙ্কা করেন।
বরিশাল জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১০ উপজেলার ৭৯ হাজার ৮৯০ জন নিবন্ধিত জেলের জন্য ১ হাজার ৯৯৭ দশমিক ২৫ টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত বিতরণ হয়েছে ১ হাজার ৮৪ দশমিক ৭ টন। জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৮৫ হাজার ২৯৫। গত পাঁচ দিনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ২৫ জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায় হয়েছে ৫১ দশমিক ০১ লাখ টাকা। উদ্ধার হয়েছে ১৬ দশমিক ২৬৩ লাখ মিটার জাল ও ০ দশমিক ২৫ টন মা ইলিশ।
হিজলার অন্তত ১০ জন জেলে ও বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গৌরবদি ইউনিয়নের কাঁকুড়িয়া বাজার সংলগ্ন খাল, ওরাকুল সড়কের মাথা, ধুলখোলা ইউনিয়নের খেয়াঘাট ও মাঝেরচর এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই মাছ শিকার, আহরণ ও বিক্রি চলছে। এসব এলাকা মূল মেঘনার পাড়ে।
তাঁদের অভিযোগ, হিজলা উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি এবং সদস্যসচিব দেওয়ান মনির হোসেন মেঘনার মাছ শিকার ও কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁদের ছত্রচ্ছায়ায় নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি আবুপুর লঞ্চঘাট, টুমচরের বেবাজিয়া পাড়া, নাচকাটি, ক্রোপ, কাঁকুড়িয়া, অন্তর্বাম, চরকিল্লা, জানপুরের তিন নম্বর ঘাট ও উলানিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, মাছ বিক্রির পর শতকরা ১০ ভাগ টাকা নেওয়া হচ্ছে। নদীতে প্রতিটি জালের জন্য গড়ে দুই হাজার টাকা করে আদায় করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো যাচাই-বাছাইয়ের অপেক্ষায়।
হিজলার একজন সংবাদকর্মী বলেন, মেঘনা এখন কার্যত জেলেদের দখলে। অভিযান হয় আশপাশের ছোট নদীতে, সেখানেও হামলার শিকার হতে হয়। তাঁর দাবি, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে সংবাদ প্রচার করতে নিষেধ করেছেন এবং সংবাদ ঠেকাতে তাঁদের লোকও আছে।
হিজলার প্রবীণ জেলে মোতালেব হোসেন বেপারী বলেন, এ বছর মেঘনায় প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে, তাই জেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। হাজার হাজার জেলে মাছ ধরছেন। তাঁর মতে, ১০টি বাহিনী একসঙ্গে নামলেও তাঁদের থামানো যাবে না।
হিজলা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াছিনুল হক বলেন, মেঘনা অনেক বড় নদী, সে তুলনায় জনবল খুবই কম। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা হিংস্র হয়ে ওঠেন। রাতে অভিযানে গিয়ে সবাইকে ঝুঁকিতে ফেলা হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী অভিযান চালানো হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি মঙ্গলবার রাতে বলেন, মেঘনায় মাছ ধরা পড়ছে, তবে তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। দেওয়ান মনির হোসেন বলেন, তাঁরা সরকারের পক্ষে আছেন, যারা মাছ ধরবে প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তিনি প্রশাসনের পক্ষেই আছেন বলে জানান।
হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস সিকদার জানান, দুই প্রভাবশালী নেতাকে ডেকে নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ শিকার না করতে সহায়তা চাওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, রাতে সব সময় অভিযান হয় না, দুই-একবার হয়। ফাঁকা সময়ের সুযোগ নিয়ে শিকার চলে। এটি বন্ধের চেষ্টা চলছে।
হিজলার ওরাকুল মাছঘাটের আড়তে প্রতিদিন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে, তবে এ নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক আড়তদারকে ফোন করা হলে তিনি পরিচয় জানতে চান। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি বলেন, আড়তে ইলিশ বিক্রি হয় না, এরপর ফোন কেটে দেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অন্য একজন আড়তদার বলেন, ইলিশ আসছে ও বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু যাঁরা নিয়ন্ত্রণ করছেন, তাঁদের ভয়ে কেউ মুখ খোলেন না। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক কেজি ওজনের ইলিশ জোড়া প্রতি প্রায় ছয় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যদিও স্বাভাবিক সময়ে এ ধরনের ইলিশের কেজি প্রায় আড়াই হাজার টাকা। আড়াই শ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, যা সাধারণত ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়।
বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেঘনার ৬০ কিলোমিটার এলাকা গুরুত্বপূর্ণ। এখানে নৌবাহিনীর একটি জাহাজ মোতায়েন করা গেলে এবং সঙ্গে কোস্ট গার্ড ও পুলিশ থাকলে মাছ শিকার বন্ধ করা যেত। তিনি বলেন, চেষ্টা চলছে, তবে অনেক কিছুই বলা সম্ভব নয়।
এ ঘটনায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত নয়, বরং সামগ্রিকভাবে দেখলে, নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সহজ, কিন্তু তা বাস্তবায়নের সক্ষমতা সীমিত। বিশাল নদী, অল্প জনবল এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে অভিযান কার্যকর হচ্ছে না। আবার সরকারি তথ্যেই দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধিত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা চালের একটি অংশ এখনো বিতরণ হয়নি। যে জেলেরা নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তার ওপর নির্ভর করেন, তাঁরা সময়মতো সহায়তা না পেলে নদীতে নামার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে প্রভাবশালী মহলের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ গুরুতর। মৎস্য কর্মকর্তার ‘সবকিছু বুঝলেও বলা যাচ্ছে না’ মন্তব্য এবং আড়তদারদের ভয়ে মুখ না খোলার বিষয়টি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। তবে এগুলো এখনো অভিযোগ। অভিযুক্ত দুই নেতা তা অস্বীকার করেছেন। স্বাধীন তদন্ত ছাড়া সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা পড়লে তার প্রভাব পড়ে আগামী বছরের উৎপাদনে। গত বছরের কঠোর অভিযানের সুফল এ বছর মিলেছে, মৎস্য কর্মকর্তাদের এমন বক্তব্য তাই তাৎপর্যপূর্ণ। এবার সেই ধারা ভেঙে গেলে ভবিষ্যতে ইলিশের সংকট আরও গভীর হতে পারে। কম দামে ইলিশ বিক্রি হওয়ার তথ্যও ইঙ্গিত দেয়, নদী থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ বাজারে আসছে।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হতে এখনো প্রায় দুই সপ্তাহ বাকি। এ সময়ে মেঘনার গুরুত্বপূর্ণ ৬০ কিলোমিটার অংশে নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড ও পুলিশের সমন্বিত নজরদারি এবং প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

