ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ইলিশ অভয়াশ্রমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার অভিযোগে এক দিনে ৩৮ জেলেকে আটক করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানে ছয়টি মাছ ধরার নৌকা, ৪১ কেজি ইলিশ ও ১ লাখ ৬৭ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় ভোলার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন উপজেলায় আলাদা অভিযান চালিয়ে এই জেলেদের আটক করা হয়। মৎস্য বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিতভাবে অভিযানে অংশ নেন।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক জেলে আটক হয়েছেন ভোলা সদর উপজেলায়। সেখানে ১৭ জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের মধ্যে ১৪ জনকে মোট ৪২ হাজার টাকা জরিমানা করেন। বাকি তিনজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এই উপজেলা থেকে তিনটি নৌকা, ১০ কেজি ইলিশ ও ২৫ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।
দৌলতখান উপজেলায় আটক হন তিনজন জেলে। তাঁরা সবাই অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে তাঁদের মুক্তি দেওয়া হয়। তবে এখানকার অভিযানে জব্দের পরিমাণ ছিল উল্লেখযোগ্য। একটি নৌকা, ১৫ কেজি ইলিশ এবং এক লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়। এক উপজেলা থেকেই এত বড় পরিমাণ জাল উদ্ধার হওয়ায় বোঝা যায়, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বড় আকারে মাছ ধরার প্রস্তুতি ছিল।
তজুমদ্দিন উপজেলায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ ধরার সময় ১০ জেলেকে আটক করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাঁদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এই উপজেলা থেকে দুটি নৌকা, ছয় কেজি মাছ ও ২০ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলায় আটক করা হয় আটজনকে। তাঁদের মধ্যে ছয়জনকে কারাদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাকি দুজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছাড়া পান। অভিযানে ১০ কেজি ইলিশ ও ২২ হাজার মিটার জাল জব্দ করা হয়।
সব উপজেলার হিসাব মিলিয়ে দেখা যায়, আটক ৩৮ জনের মধ্যে ১৬ জন কারাদণ্ড পেয়েছেন, ১৪ জনকে জরিমানা করা হয়েছে এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক আটজনকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আটক জেলেদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই শিশু বা কিশোর। এই তথ্য একটি বড় সামাজিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। নদীতীরের দরিদ্র পরিবারগুলোতে অনেক সময় অল্পবয়সীরাও জীবিকার তাগিদে মাছ ধরার কাজে নামে। নিষেধাজ্ঞার সময় বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা না থাকলে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে।
জব্দ করা মালামালের ব্যবস্থাও জানিয়েছেন জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জব্দ করা ইলিশ এতিমখানায় বিতরণ করা হয়েছে এবং জাল আগুনে পুড়িয়ে নষ্ট করা হয়েছে। জব্দ নৌকাগুলো নিলামে বিক্রি করা হবে এবং সেই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা পড়বে।
ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি মাছ। এর প্রজনন ও সংরক্ষণের স্বার্থেই নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। অভয়াশ্রমে নিষেধাজ্ঞা না মানলে প্রজননক্ষম মাছ ধরা পড়ে, যার প্রভাব পড়ে ভবিষ্যতের মজুদে। তাই প্রশাসন অভিযানে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। একই সঙ্গে নৌকা নিলাম ও জাল ধ্বংসের মতো ব্যবস্থা নিষেধাজ্ঞা ভাঙার প্রবণতা কমানোর বার্তা দিচ্ছে।
তবে শুধু অভিযান ও শাস্তি দিয়ে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যায়। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের জীবিকা চালানোর বিকল্প সহায়তা কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয়। সহায়তা পর্যাপ্ত ও সময়মতো না পৌঁছালে অনেক জেলে ঝুঁকি নিয়েই নদীতে নামেন। আবার নিয়ম ভাঙার সুযোগ কমাতে নজরদারি ধারাবাহিকভাবে চালু রাখাও জরুরি। সংরক্ষণ ও জীবিকার এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ভোলার নদীতে অভিযান চলছে।

