নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের হত্যাকাণ্ডে মামলা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমার করা মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার তেলনজিয়া এলাকায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শোকে ভেঙে পড়া পরিবার এখন হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাইছে।
আলিফ বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি। তাঁর বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। বাবার নাম মহব্বত আলী ফকির। বিয়ের পর তিনি দুর্গাপুরের তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় স্বজনেরা বাড়ির বাইরে বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে চায়ের দোকানের কাছে গিয়ে তাঁরা আলিফকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। আলিফের চাচাশ্বশুর বিশু সাংমা জানান, শোনা যাচ্ছে দুজন গুলি করেছেন এবং আরও দুজন কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বজনেরা এগিয়ে আসার আগেই হামলাকারীরা পালিয়ে যান। শুক্রবার ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, চায়ের দোকানের সামনে যেখানে তাঁকে গুলি করা হয়, সেখানে রক্তের দাগ শুকিয়ে আছে। জায়গাটি তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় ২০ গজ দূরে।
শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ সাংবাদিকদের জানান, আলিফের বুকে তিনটি গুলির আঘাত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে, আরেকটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া একটি গুলি কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে গেছে। ক্ষতের ধরন দেখে চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল। সব মিলিয়ে তাঁর শরীরে ছয়টি গুলির আঘাত পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত শেষে কলমাকান্দার সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান শনিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে মুঠোফোনে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। মামলাটি অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হওয়ায় তদন্তের প্রথম কাজ হবে হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করা। হত্যার কারণ ও পেছনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখন পর্যন্ত পুলিশের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আলিফের ওপর এটিই প্রথম হামলা নয়। স্বজনেরা জানান, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করেছিল। তখন তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। ওই ঘটনায় আলিফ নিজে বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে। তাঁরা এখন জামিনে মুক্ত আছেন। তবে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। পুলিশের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির জানান, তাঁরা তিন ভাই ও চার বোন। আলিফ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক ছিলেন। অবসরের পর কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। পরে দুর্গাপুরে আদিবাসী নারী আনন্দিতা সাংমাকে বিয়ে করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। বাড়িতে তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। শহীদ ইসলামের ভাষ্য, সাংবাদিকতা করার কারণে ভাইয়ের অনেক শত্রু তৈরি হয়েছিল। যাঁরা এতগুলো গুলি করে নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করেছেন, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান তিনি।
স্বামীকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। তিনি বলেন, -‘আমার স্বামী আমার কাছে সুপারম্যান ছিলেন, সুপারহিরো হয়ে থাকবেন’ এবং মৃত্যুর আগপর্যন্ত এই স্মৃতি তিনি ভুলতে পারবেন না। আনন্দিতা জানান, বিয়ের পর একটি রাতও আলিফ তাঁকে ছাড়া থাকতেন না। তাঁর পড়াশোনার পেছনে আলিফের অবদান ছিল। আনন্দিতা নার্সিং পাস করেছেন এবং আলিফ তাঁর চাকরির ব্যবস্থা করছিলেন। আলিফ বলতেন, ঢাকা বা সিলেটে চাকরি হলে তাঁরা সেখানে চলে যাবেন। এখন দুটি ছোট সন্তান নিয়ে কীভাবে থাকবেন, সেই দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন আনন্দিতা।
আলিফের ফুফুশাশুড়ি রুলি রেমা বলেন, জামাই খুব ভালো মনের মানুষ ছিলেন। গারো সম্প্রদায়ের মানুষ তাঁকে ভালোবাসতেন, তিনিও এই সম্প্রদায়ের মানুষদের পছন্দ করতেন। তাঁকে এলাকায় মেরে ফেলার কষ্ট তাঁরা কখনো ভুলতে পারবেন না।
আলিফের শাশুড়ি শিলা রাংসা মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর অভিযোগ, দুর্গাপুরে গত কয়েক বছরে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু কেউ বিচার পায়নি। তিনি উল্লেখ করেন, সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর নামের একজন, দুর্গাপুর বাজারে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং আদিবাসী নেতা ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমা খুন হয়েছেন। তাঁর দাবি, এসব ঘটনার কোনোটিরই আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, এখন তাঁরা কার কাছে বিচার চাইবেন। দুটি ছোট বাচ্চা নিয়ে মেয়ে কীভাবে চলবে, সেই চিন্তাও তাঁকে কাতর করেছে। তিনি নিজেও গরিব বলে জানান। এ ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচারের দাবি জানিয়েছে।
সাংবাদিক হত্যার ঘটনা সব সময়ই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে আনে। আলিফ নিজে স্থানীয় অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে সরব ছিলেন এবং আগে একবার হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেই হামলার মামলার আসামিরা জামিনে মুক্ত থাকা অবস্থায় এমন হত্যাকাণ্ড ঘটায় সাংবাদিকের নিরাপত্তা, আগের মামলার অগ্রগতি এবং আসামিদের জামিনের পর নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে হত্যার পেছনে সাংবাদিকতা-সংশ্লিষ্ট কোনো কারণ ছিল কি না, তা তদন্তের আগে নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। পরিবারের সদস্যরা অবশ্য সাংবাদিকতার কারণে শত্রু তৈরি হওয়ার কথা বলেছেন।
স্থানীয়দের মধ্যেও এ ঘটনায় আতঙ্ক ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে বলে পরিবারের বক্তব্যে ইঙ্গিত মেলে। দুর্গাপুরে অতীতের একাধিক হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার অভিযোগ থাকায় এবারের তদন্ত কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে এগোয়, সেদিকে নজর থাকবে। আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনই এখন তদন্তের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

