প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চাকরির পরীক্ষার্থীদের কাছে বিক্রির এক সংগঠিত চক্রের সন্ধান পেয়েছে তদন্তকারীরা। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার বিনিময়ে প্রার্থীদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকার লিখিত চুক্তি করানো হতো। টাকা পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত রেখে দেওয়া হতো প্রার্থীদের মূল শিক্ষাসনদ। যাঁরা আগাম টাকা দিতে পারতেন না, তাঁদের কাছ থেকে নেওয়া হতো স্বাক্ষর করা ব্যাংক চেক। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছেন।
চুক্তির ধরনটি নিজেই বলে দেয়, এটি কোনো এলোমেলো বা সাময়িক প্রতারণা ছিল না। ১০০ টাকার স্ট্যাম্পে চুক্তি, মূল সনদ জিম্মি রাখা এবং চেকের পাতা জামানত হিসেবে নেওয়া, এই তিন স্তরের ব্যবস্থা প্রমাণ করে চক্রটি টাকা আদায়ের বিষয়ে আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রেখেছিল। চাকরিপ্রার্থীর আর্থিক সামর্থ্য যা-ই হোক, তাঁকে যেন কোনোভাবেই বেরিয়ে যেতে না দেওয়া যায়, সেই কৌশলই এখানে স্পষ্ট।
গত বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অভিযান চালিয়ে এই সাতজনকে গ্রেপ্তার করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন বা এসআরবি। তাঁদের কাছ থেকে ১০০ টাকা মূল্যের ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি মূল সনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা এবং একটি চেক বই জব্দ করা হয়েছে। গতকাল শনিবার আদালতের নির্দেশে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০), কম্পিউটার অপারেটর মো. জাহাঙ্গীর (৩৮), কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩) ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩)। বাকি দুজন মফিজুল ইসলাম (২৩) ও মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন। তদন্তসংশ্লিষ্টরা তাঁদের চক্রের সদস্য বলে উল্লেখ করেছেন।
গ্রেপ্তারদের পরিচয়ে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। তাঁদের বড় অংশই সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের নিম্নপদস্থ কর্মচারী, যাঁদের কাজ অফিস সহায়তা, কম্পিউটার চালানো বা তথ্য সংরক্ষণের মতো। অর্থাৎ ফাঁসের পেছনে যেমন প্রশ্নপত্রের উৎস কোথায়, সেই প্রশ্ন রয়েছে, তেমনি পরিবেশ, প্রতিরক্ষা ও রাজস্ব খাতের কর্মীদের একই জালে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিও আলাদা তদন্তের দাবি রাখে।
এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, মতিঝিল থানায় করা মামলার ছায়া তদন্ত চালাচ্ছে তাঁর বাহিনী। তাঁর ভাষ্য, প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়ার শর্তে চক্রের সদস্যরা প্রার্থীদের সঙ্গে স্ট্যাম্পে ১০ লাখ টাকার চুক্তি করতেন। পুরো টাকা না পাওয়া পর্যন্ত প্রার্থীদের মূল সনদ চক্রের হেফাজতেই থাকত। আগাম টাকা দিতে না পারলে প্রতিটি চেকের বিপরীতে দুই থেকে তিন লাখ টাকা লিখে স্বাক্ষরসহ জমা নেওয়া হতো।
এসআরবির আরেক কর্মকর্তা জানান, অন্তত ৪০ জন চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে এভাবে দুই থেকে তিন লাখ টাকার চেক নেওয়া হয়েছে। এই সংখ্যা থেকে একটি আভাস মেলে। চেক জমা দেওয়া প্রার্থীই যদি ৪০ জন হন, তাহলে যাঁরা নগদে বা অন্য উপায়ে টাকা দিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তদন্তকারীরা এখনো সেই হিসাব মেলাননি, তবে চক্রের বিস্তার যে ছোট নয়, তা ইঙ্গিত করছে জব্দ করা কাগজপত্রই।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, প্রশ্নপত্র আসলে কার কাছ থেকে, কীভাবে চক্রের হাতে পৌঁছাল। এসআরবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। এই প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে, ঘটনাটি কয়েকজন মধ্যস্থতাকারীর অপরাধ হিসেবে সীমিত থাকবে, নাকি প্রশ্ন তৈরি বা সংরক্ষণের পর্যায়েও দায়ীদের খোঁজ মিলবে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, প্রশ্ন ছড়ানোর সময়সূচি ছিল ঘড়ি ধরা। পরীক্ষার দিন, অর্থাৎ ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি পান এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ। সকাল সোয়া ছয়টার দিকে একই প্রশ্নপত্রের আরও স্পষ্ট ছবি পান একই প্রতিষ্ঠানের কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর। এরপর প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা হয় এবং তা চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে পাঠানো হয়। তাঁদের মাধ্যমে উত্তর পৌঁছে যায় সম্ভাব্য পরীক্ষার্থী ও প্রশ্নপত্রের ক্রেতাদের কাছে।
এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, পরীক্ষা শুরুর অন্তত ছয় ঘণ্টা আগেই প্রশ্ন বাইরে চলে গিয়েছিল। অস্পষ্ট ছবি থেকে স্পষ্ট ছবিতে যাওয়ার ফারাক বলে দেয়, প্রশ্নপত্র একাধিক হাত ঘুরেছে। লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীনের ভাষ্য, এনবিআরের কর্মচারীদের হাত ঘুরেই ফাঁস হওয়া প্রশ্নের উত্তর চক্রের অন্য সদস্যদের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই দিন, ১০ অক্টোবর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগের বাছাই পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। ২৪২টি শূন্য পদের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার যোগ্য ছিলেন ৩ লাখ ১৮ হাজার ৯৭৬ জন। সূচি অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরের ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পরীক্ষা শুরুর আগেই ফাঁসের খবর ছড়িয়ে পড়ে। সকাল ১০টা ৩ মিনিটে ফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা স্থগিত করে।
প্রতি পদের বিপরীতে প্রতিযোগীর হিসাব করলে চিত্রটি আরও স্পষ্ট হয়। ২৪২ পদের জন্য লড়ছিলেন তিন লাখের বেশি প্রার্থী, অর্থাৎ একটি পদের জন্য গড়ে এক হাজারের বেশি। এমন তীব্র প্রতিযোগিতার বাজারে প্রশ্ন কিনে এগিয়ে যাওয়ার প্রলোভন কাজে লাগিয়েছে চক্রটি। ১০ লাখ টাকার চুক্তির পেছনে কাজ করেছে সরকারি চাকরি পাওয়ার প্রত্যাশা, যা প্রার্থীদের বড় অঙ্কের ঝুঁকি নিতে প্ররোচিত করেছে। এই প্রলোভনে যাঁরা সাড়া দিয়েছেন, তাঁদের ভূমিকাও আইনি দৃষ্টিতে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার খবরে ক্ষুব্ধ প্রার্থীরা সেদিন রাজধানীর সাতমসজিদ রোড ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেন। পরদিন, ১১ অক্টোবর, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (প্রশাসন) মো. আতিকুর রহমান বাদী হয়ে মতিঝিল থানায় মামলা করেন।
মামলার তদন্তের দায়িত্বও এখন হাতবদল হচ্ছে। পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানিয়েছেন, মামলাটি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মীর্জা মোহাম্মদ মুক্তা জানান, আজ রোববার নথিপত্র সিআইডির কাছে হস্তান্তর করা হবে। অর্থাৎ এসআরবির ছায়া তদন্তের পাশাপাশি এবার সিআইডিও মূল তদন্তের ভার নিচ্ছে। দুই সংস্থার সংগ্রহ করা তথ্য কতটা সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটি মামলার অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব এর প্রধান। কমিটি এখনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়নি। এর মধ্যে গত শুক্রবার নতুন করে নিয়োগ পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।
ফলে একই ঘটনার তদন্ত এখন তিন স্তরে চলছে: এসআরবি, সিআইডি ও মন্ত্রণালয়ের কমিটি। প্রশাসনিক কমিটি মূলত প্রতিষ্ঠানের ভেতরের দুর্বলতা খুঁজবে, আর ফৌজদারি তদন্ত খুঁজবে অপরাধের শৃঙ্খল। দুটি ধারার ফল মিলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, প্রশ্নপত্র সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ঠিক কোথায় ফাঁক ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী সংস্কার দরকার।
পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হলেও ফাঁসের প্রভাব সহজে মিটছে না। যাঁরা সৎভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন, তাঁদের সময় ও মানসিক চাপ দুটোই বেড়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের আস্থায়ও ফাটল ধরেছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে শুধু সাতজনের গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়, প্রশ্নের মূল উৎস শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিচারের আওতায় আনাই হবে প্রকৃত পরীক্ষা।

