সাগর শান্ত হতেই কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে মানবপাচারকারী চক্র। গত এক সপ্তাহে সাগরপথে পাচারের সময় রোহিঙ্গাসহ অন্তত দেড় শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটক হয়েছেন অন্তত ১৫ জন দালাল। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাচারের জন্য মানুষ জোগাড় করতে এখন প্রলোভনের পাশাপাশি অপহরণকেও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো। এই চক্রের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছেন না শারীরিক প্রতিবন্ধী তরুণ থেকে স্কুলশিক্ষার্থী পর্যন্ত কেউ।
টেকনাফের এনামুল হক কায়েস স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারেন না। তবু তিনিই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য। হ্নীলার একটি বনফুলের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন। প্রায় ১০ দিন আগে তিনি হঠাৎ নিখোঁজ হন। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পরিবার তাঁর সন্ধান পায়নি। পরে সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে নৌবাহিনীর উদ্ধার করা ৭৬ জনের তালিকায় তাঁর নাম পাওয়া যায়। পরিবারের দাবি, কায়েসকে অপহরণ করে পাচারের উদ্দেশ্যে দালালদের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল। এরপর সাগরপথে তাঁকে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর চেষ্টা চলে।
কায়েসের বাবা আহমুদুল রহমান বলেন, তাঁর ছেলে প্রতিবন্ধী হলেও সংসারের একমাত্র ভরসা ছিলেন। একদিন দোকানদার ফোন করে জানতে চান, ছেলে বাড়ি ফিরেছে কি না। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, ছেলে নিখোঁজ। পরে জানতে পারেন, নৌবাহিনীর উদ্ধার করা লোকদের মধ্যে তাঁর ছেলেও আছে।
কায়েস একা নন। আয়াত উল্লাহ, মো. জয়নাল ও ওয়াকিব উল্লাহসহ টেকনাফের আরও কয়েকজন তরুণের বিরুদ্ধেও অপহরণের পর সাগরপথে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক সংগ্রহের পাশাপাশি অপহরণকেও কৌশল হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে চক্রগুলো। মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার উপকূলের অরক্ষিত ঘাট ও দুর্গম এলাকা ব্যবহার করে চলছে এই তৎপরতা। হোয়াইক্যং, হ্নীলা, বাহারছড়া, টেকনাফ সদর ও শাহপরীর দ্বীপসহ পাহাড়ি ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অপহরণ ও পাচারের ঝুঁকি বেশি।
নৌবাহিনীর হাতে উদ্ধার হওয়া আয়াত উল্লাহ টেকনাফ সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। তাঁর বর্ণনায়, একদিন বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর টার্মিনাল এলাকা থেকে কয়েকজন তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। মৌচনী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাহাড়ে তাঁকে জিম্মি করে রাখা হয়, যেখানে তাঁর মতো আরও অনেককে আটকে রাখা হয়েছিল। আয়াত উল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে তাঁকে ৩০ হাজার টাকায় এক দালালের কাছে বিক্রি করা হয়। ওই দালাল আবার তাঁকে আরও এক লাখ টাকায় অন্য একজনের কাছে বিক্রি করেন। প্রায় এক মাস পাহাড়ে আটকে রাখার পর তাঁদের নিয়ে আসা হয় বাহারছড়ার কচ্ছপিয়া এলাকায়। সেখান থেকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন সাগরে একটি ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়।
আয়াত উল্লাহ বলেন, তিন দিন সাগরে চলার পর বোটটি বিকল হয়ে যায় এবং পানি ঢুকতে শুরু করে। সবাই ভয় পেয়ে যান, মনে হচ্ছিল প্রাণে ফেরা হবে না। পরে নৌবাহিনী তাঁদের উদ্ধার করে।
সাম্প্রতিক উদ্ধার অভিযানের চিত্রও উঠে এসেছে। সেন্টমার্টিনের কাছাকাছি এলাকা থেকে ১১ দালালসহ ৭৬ জনকে উদ্ধার করেছে নৌবাহিনী। এর আগে বাহারছড়ার কচ্ছপিয়ায় পাচারের সময় রোহিঙ্গাসহ ১৬ জনকে উদ্ধার করে পুলিশ। রাজারছড়ার পাহাড়ি এলাকায় পাচারকারীদের ২০টি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয় বিজিবি ও পুলিশ। সেখানে পাচারের উদ্দেশ্যে অপহৃত ১৬ জনকে উদ্ধার এবং একজন দালালকে আটক করা হয়। গত সোমবার কচ্ছপিয়ায় সাগরপথে পাচারের প্রস্তুতির সময় পাঁচজনকে উদ্ধার করে এসআরবি।
এসআরবি-১৫-এর সহকারী পরিচালক (ল অ্যান্ড মিডিয়া) আ. ম. ফারুক বলেন, সাগর শান্ত হওয়ায় দালালরা আবার সক্রিয় হয়েছে। পাচারের জন্য জড়ো করে রাখা বেশ কিছু মানুষকে দালালসহ উদ্ধার করা হয়েছে। পাচারকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাঁর উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক অপরাধী দ্রুত কারামুক্ত হয়ে আবার একই অপরাধে জড়াচ্ছে। জনসচেতনতা ও সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকনাফে অপরাধ ঠেকানো কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, কিছু নৌকার মালিক, মাঝি-মাল্লা এবং স্থানীয় ও রোহিঙ্গা দালাল চক্র অপহরণ ও মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কক্সবাজার উপকূল দিয়ে মালয়েশিয়াগামী ৩ হাজার ৫৩৪ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁদের বেশির ভাগই রোহিঙ্গা। এসব ঘটনায় উখিয়া ও টেকনাফ থানায় মামলা হয়েছে ১২০টি। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে একসঙ্গে ২৬৩ জনকে উদ্ধার করা হয়। গত তিন বছরে টেকনাফে ৩৩০ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন বলেও তথ্য রয়েছে।
অপহরণ ও পাচার যে একই সূত্রে গাঁথা, তার প্রমাণ মিলছে ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে। হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে মোস্তাক আহমেদ নামে এক ব্যক্তিকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে পাহাড়ি সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা। পরিবারের কাছে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। দর-কষাকষির পর পাঁচ লাখ টাকায় তিন দিন পর তিনি মুক্তি পান। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপহরণ এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। মুক্তিপণ দিতে না পারলে অনেক ভুক্তভোগী পরে পাচারের শিকার হন।
সাবরাং ইউনিয়নের কচুবনিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সাবের (৩২) তেমনই একজন। তিনি জানান, অপহরণকারীরা তাঁকে পাহাড়ি আস্তানায় তিন দিন আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন করে। পরে শামলাপুর উপকূল থেকে ট্রলারে তুলে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। প্রায় চার বছর পর ২০২৪ সালের ৯ অক্টোবর তিনি দেশে ফেরেন। নির্যাতনে তাঁর মাথা ও চোখে স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, ফলে এখন স্বাভাবিক কাজ করতে পারেন না। টেকনাফের অনেক পরিবারেই এমন বেদনার গল্প আছে। কেউ ফিরেছেন, আবার অনেকে আর ফেরেননি।
সাগরপথের ঝুঁকিও ভয়াবহ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএমের যৌথ বিবৃতি অনুযায়ী, গত জুনে মিয়ানমারের রাখাইন উপকূল থেকে যাত্রা করা রোহিঙ্গাবাহী দুটি নৌকা ডুবে ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। নিহতদের মধ্যে বাংলাদেশের শরণার্থীশিবির থেকে যাত্রা করা রোহিঙ্গারাও ছিলেন। সংস্থা দুটির তথ্যে, চলতি বছর আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নিহত বা নিখোঁজ হয়েছেন।
আন্দামান সাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলারের নিখোঁজ যাত্রীদের একজন টেকনাফ সদরের নেংগুলবিল গ্রামের কৃষক বেলাল মিয়া। তাঁর স্ত্রী আয়েশা বেগম তিন সন্তানের মা, এখন অন্তঃসত্ত্বা। প্রায় তিন মাস ধরে স্বামীর খোঁজ নেই। আয়েশা বলেন, তাঁর স্বামী পানের বরজে কাজ করে সংসার চালাতেন। একদিন ফোনে জানিয়েছিলেন, দালালরা জোর করে বোটে তুলে দিয়েছে, দোয়া করতে। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি। পরে জানতে পারেন, ট্রলারটি ডুবে গেছে। স্বামীকে হারিয়ে কীভাবে বাঁচবেন, সেই প্রশ্নই এখন তাঁকে তাড়া করছে।
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ফরিদ উল্লাহ বলেন, সাগর শান্ত হতেই পাচারকারীরা আবার সক্রিয় হয়েছে। অনেকে কারামুক্ত হয়ে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছেন। পাহাড় ও মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন এলাকায় দালালদের তৎপরতা বেড়েছে। তাঁর তথ্য, কয়েক দিনেই পাচারের জন্য জড়ো করা অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষকে বিভিন্ন আস্তানা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী জানিয়েছেন, পাচারের জন্য তাঁদের অপহরণ করা হয়েছিল।
এই অপরাধ ঠেকানোর পথে বড় বাধা বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি। জেলা পুলিশ ও জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত কক্সবাজারে ৬০০টির বেশি মানবপাচার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৮০টি এখনো বিচারাধীন, আর ৩০০টির বেশি মামলা উখিয়া ও টেকনাফের। আইনে দ্রুত বিচারের বিধান থাকলেও দীর্ঘসূত্রতায় অধিকাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ সুযোগে অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে আবার পাচারচক্রে জড়িয়ে পড়ছেন।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী বিশ্বজিৎ ভৌমিক বলেন, কক্সবাজার মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হলেও এখানে এখনো পৃথক মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনাল চালু হয়নি। ফলে প্রায় ৫০০ মামলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন থাকায় নিষ্পত্তিতে দেরি হচ্ছে। তিনি মনে করেন, পৃথক ট্রাইব্যুনাল চালু এবং সাক্ষী ও ভুক্তভোগীদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করা গেলে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শরিফুল ইসলাম হাসান বলেন, ২০১৪-১৫ সালে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়ায় গণকবরের ঘটনা প্রকাশের পর মানবপাচার কিছুটা কমলেও ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের আগমনের পর বিয়ে ও কাজের প্রলোভনে পাচার আবার বেড়ে যায়। তাঁর ভাষ্য, পাচারকারীরা এখন কৌশল বদলে প্রলোভনের পাশাপাশি অপহরণের মাধ্যমেও ভুক্তভোগী সংগ্রহ করছে। মানবপাচার, মাদক, চোরাচালান ও হুন্ডি চক্র পরস্পর সম্পর্কিত হওয়ায় সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ এবং মূল হোতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা জরুরি বলে তিনি মনে করেন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. অহিদুর রহমান বলেন, অপহরণ ও মানবপাচার একই সূত্রে গাঁথা অপরাধ। অনেক ক্ষেত্রে মুক্তিপণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে অপহৃতদের পাচারের শিকার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, এসব অপরাধের আন্তসম্পর্ক বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। তবে জনসচেতনতা ও সবার সহযোগিতা ছাড়া এই অপরাধ রোধ কঠিন।
এই চিত্র থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট। উদ্ধার ও আটকের অভিযান চললেও চক্রের মূল কাঠামো ভাঙা যায়নি। দালাল ধরা পড়লেও দ্রুত জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজে ফিরছেন, আর বিচার ঝুলে থাকায় ভয়ের পরিবেশও কাটছে না। মৌসুম বদলে সাগর শান্ত থাকার এই সময়ে ঝুঁকি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপকূলের অরক্ষিত ঘাট পাহারা, পাহাড়ি আস্তানা নির্মূল এবং মূল হোতাদের শনাক্ত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা না গেলে টেকনাফের পরিবারগুলোর এই দুর্ভোগ থামবে না। এখন নজর থাকবে পৃথক ট্রাইব্যুনাল চালুর উদ্যোগ এবং অপহরণ ও পাচারের নেটওয়ার্ক ভাঙতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের দিকে।

