চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর, এই নয় মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ১ হাজার ১৩টি ঘটনায় ৭৩ জন নিহত ও ৬ হাজার ৪৭৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির ৪৬ জন, প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৬ জন।
একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে ১৮৭ জনের। কারাগারে মারা গেছেন ৯৫ বন্দি, আর নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন ৫১৮ জন সাংবাদিক। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংগঠনটি জানিয়েছে, ১৬টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ এবং নিজস্ব তথ্য ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। গতকাল সোমবার এটি প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার সবচেয়ে বড় অংশের কেন্দ্রে ছিল বিএনপি। এক হাজার ১৩টি ঘটনার মধ্যে ৯৩১টি, অর্থাৎ ৯১ শতাংশ ঘটেছে দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এবং অন্য দলগুলোর সঙ্গে সংঘাতে। বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৩৪২টি ঘটনায় ৪০ জন নিহত ও দুই হাজার ৬৩২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩২১টি সংঘর্ষে ১১ জন নিহত ও দুই হাজার ১৯০ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ৯৩টি সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন নয় জন, আহত ৫৪৫ জন।
অন্য সংঘাতের চিত্রও প্রতিবেদনে আছে। বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে ৪৭টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩২০ জন। বিএনপি ও অন্যান্য দলের মধ্যে ১২৮টি সংঘর্ষে আহত ৩২০ জন। আওয়ামী লীগ ও এনসিপির পাঁচটি সংঘর্ষে আহত ৫৮ জন। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের দুটি সংঘর্ষে একজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অন্তর্কোন্দলের একটি ঘটনায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যান্য ছোট-বড় দলের মধ্যে ৭৪টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৪০৫ জন আহত হয়েছেন।
নিহত ৭৩ জনের রাজনৈতিক পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিএনপির ৪৬ জন (৬৩ শতাংশ), জামায়াতের আট জন (১১ শতাংশ) এবং আওয়ামী লীগের ছয় জন (৮ শতাংশ)। এ ছাড়া একজন চরমপন্থী, একজন সাধারণ নারীসহ অন্য দল বা অজ্ঞাত পরিচয়ের ১২ জন রয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জেরে বেশির ভাগ সহিংসতা ঘটেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাবেশকেন্দ্রিক সংঘাত, প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি। এ ছাড়া দুর্বৃত্তদের হাতে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৮৮টি ঘটনায় ৫২ জন নিহত ও কমপক্ষে ১০০ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ৩০, আওয়ামী লীগের ১১, জামায়াতের পাঁচ এবং অন্য দলের ছয় জন। এই সময়ে ১৫০ জনের বেশি রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সারা দেশে সহস্রাধিক বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার আলাদা হিসাবও দিয়েছে সংগঠনটি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে ৪০২টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও দুই হাজার ৬২৩ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির নয়, জামায়াতের দুই, আওয়ামী লীগের একজন এবং অজ্ঞাত পরিচয়ের একজন। নির্বাচনের আগে ও পরে ছয় শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ও নির্বাচনি কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। এই সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১২৩টি ঘটনায় আটজন নিহত ও ৯৪১ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২৩৪টি ঘটনায় চারজন নিহত ও এক হাজার ৪৩৮ জন আহত হয়েছেন।
গ্রেপ্তার ও মামলার চিত্রও উঠে এসেছে। এই সময়ে বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ২৭০টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় পাঁচ হাজার ৮০৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং ৩২ হাজার ৪৩৩ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছেন পাঁচ হাজার ৬৪৪ জন নেতা-কর্মী। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের চার হাজার ৮২৭, বিএনপির ৬০৯, জামায়াতের ১৪৫, এনসিপির ৪৩ এবং চরমপন্থী ৩৭ জন। এর বাইরে সন্ত্রাস, নাশকতা ও পরোয়ানাভুক্ত আসামি ধরতে নিয়মিত অভিযানে ৬৩ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মব সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টাসহ নানা অভিযোগে সারা দেশে গণপিটুনি ও মবের ৩৯৮টি ঘটনায় ১৮৭ জন নিহত ও ৪০১ জন আহত হয়েছেন।
সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতনের ২৮৮টি ঘটনায় ৫১৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আহত ২৯৭, লাঞ্ছিত ৮৭ এবং হুমকির মুখে পড়েছেন ৭৭ জন। আটক হয়েছেন ২০ জন। সাইবার নিরাপত্তা আইন-২০২৬-এর অধীনে ৫১ জন সাংবাদিককে আসামি করে ১৯টি মামলা হয়েছে।
সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংগঠনটি। এই সময়ে ৫৮টি সভা ও সমাবেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা দিয়েছে। এতে ৪৩৯ জন আহত ও ৪৬ জন আটক হয়েছেন। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ-২০২৫ ও সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬-এর বিভিন্ন ধারায় ৪০টি মামলায় ১১৩ জন অভিযুক্ত হয়েছেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৫৫ জন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ার অভিযোগে আটক হয়েছেন ১২ জন। রাজনৈতিক ইস্যু, জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানহানিকর কনটেন্ট ও কটূক্তির জেরে চারজন নিহত, চারজন নির্যাতিত, ২১ জন আটক ও ২০টি মামলা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক হয়েছেন ২৪ জন, একই সংখ্যক মামলা হয়েছে। এ ছাড়া সাইবার বুলিং ও ফেসবুকে সমালোচনার অভিযোগে আরও ২৯ জনকে আটক করা হয়েছে।
কারাগার ও হেফাজতে মৃত্যু নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এই সময়ে কারাগারে ৯৫ আসামির মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের ৪০ জন কয়েদি ও ৫৫ জন হাজতি। নথি অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের ২০ জন, বিএনপির একজন এবং ৭৪ জন সাধারণ বন্দি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজত, নির্যাতন, গুলি ও কথিত বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হেফাজত ও নির্যাতনে ১২, গুলিতে দুই ও বন্দুকযুদ্ধে তিনজন। গ্রেপ্তার এড়াতে পালাতে গিয়ে বহুতল ভবন থেকে পড়ে বা পানিতে ডুবে অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। পুলিশ অটোরিকশা জব্দ করায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে একজন চালকের মৃত্যুর কথাও প্রতিবেদনে আছে।
গুম ও জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগে প্রতিবেদনে অন্তত দুটি ঘটনার উল্লেখ আছে। গত ১০ এপ্রিল বাগেরহাটের মোংলায় কোস্ট গার্ড পরিচয়ে মিরাজ শেখ (৩২) নামের এক যুবককে গুম করার অভিযোগ আছে। ২৬ আগস্ট রাজধানীর মিরপুর থেকে সাদা পোশাকে শামীম খান নামের এক ব্যবসায়ীকে তুলে নেওয়া হয় এবং দুই দিন পর সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় আটক দেখানো হয়।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ৫৬টি ঘটনায় ৬২ জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে ২১টি মন্দির, ২০টি প্রতিমা ও ৪৭টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে। জমি দখলের চারটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। নদী, খাল, জঙ্গল ও পরিত্যক্ত স্থান থেকে দুর্বৃত্তদের হাতে নিহত ৪৯১ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, যার মধ্যে বস্তাবন্দি ৪৬, ঝুলন্ত ৮৭ এবং একাধিক আঘাতের চিহ্নসহ ৭৪টি।
সীমান্তের চিত্রও উদ্বেগজনক। ভারত সীমান্তে বিএসএফের হামলার ৪৩টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৯ জন আহত হয়েছেন, আটক হয়েছেন ৪৪ জন। মিয়ানমার সীমান্তে ২৪টি সহিংসতায় একজন নিহত, ছয়জন আহত ও ৮৩ জন আটক হয়েছেন। আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে আট জনের মৃত্যু ও পাঁচ জন আহত হয়েছেন।
শ্রমিকদের অবস্থাও ভালো নয়। ৫৮২টি নির্যাতনের ঘটনায় ১৪৫ জন শ্রমিক নিহত ও এক হাজার ২৬৩ জন আহত হয়েছেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে কর্মক্ষেত্রে মারা গেছেন ৩৯০ জন। বেতন-ভাতার দাবিতে আন্দোলনের সময় আটক হয়েছেন ২৬ জন।
নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার তথ্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক। নয় মাসে দুই হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৬৫৭ জন ধর্ষণের শিকার, যাঁদের ৩৯২ জন (৬০ শতাংশ) ১৮ বছরের কম বয়সী। ১৩০ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন, আর ধর্ষণের পর খুন হয়েছেন ২৯ জন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৬৯৬ জন, যাঁদের ২৭৬ জন শিশু। যৌতুকের কারণে ৩২ জন নিহত হয়েছেন। পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪৫৭ জন নারী। একই সময়ে এক হাজার ৮১০ শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যাদের অন্তত ৪৯৪ জন প্রাণ হারিয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সব স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সহিংসতা, মব, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশে হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা, হেফাজত ও কারাগারে মৃত্যু এবং নতুন করে গুম ও জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার অভিযোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তিনি সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনকে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে বলেন।
প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর ও সংগঠনটির নিজস্ব অনুসন্ধানের ওপর নির্ভরশীল। তাই এটি সরকারি পরিসংখ্যান নয় এবং সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবু ক্ষমতাসীন দলের ভেতরের কোন্দলই যে সহিংসতার বড় উৎস, সেই চিত্র স্পষ্ট। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকায় প্রার্থিতা ও আধিপত্য নিয়ে সংঘাত বাড়ার শঙ্কা থেকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও দ্রুত বিচারই সহিংসতা কমানোর মূল পথ বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
সূত্র: জাগো নিউজ

