আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সেজে ব্যবসায়ীকে দোকান থেকে তুলে নিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে একটি চক্রের ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর প্রেমবাজার থেকে অপহৃত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ এহছান ওরফে হাসানকে বুধবার কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বাঁশখালী থানা-পুলিশের যৌথ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, যাঁকে চক্রের মূল হোতা বলছে পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর রাত সাড়ে আটটার দিকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ির প্রেমবাজারে মেসার্স আব্দুল্লাহ এন্টারপ্রাইজ নামের হার্ডওয়্যারের দোকানে বসে ছিলেন এহছান। তখন কালো পোশাকের ওপর এসআরবি লেখা জ্যাকেট, কালো ক্যাপ ও মুখে মাস্ক পরা কয়েকজন দোকানে ঢোকেন। তাঁরা নিজেদের এসআরবি সদস্য পরিচয় দেন এবং এহছানের যমজ ভাই মো. হোছাইনের ছবি দেখিয়ে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন।
এহছান নিজের পরিচয় দেওয়ার পর তাঁরা তাঁর দুই হাত পেছনে নিয়ে হ্যান্ডকাফ পরান। এরপর টানাহেঁচড়া করে দোকান থেকে বের করে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন যানবাহনে বদল করে তাঁকে কক্সবাজারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
অপহরণের কয়েক ঘণ্টা পর, ওই রাত ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ব্যবসায়ীর স্ত্রী ও দোকানের ব্যবস্থাপকের মুঠোফোনে বিভিন্ন ভিওআইপি নম্বর থেকে কল আসতে থাকে। ফোনে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয় এবং টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় এহছানের ভাই মো. হোছাইনের করা এজাহারের ভিত্তিতে বাঁশখালী থানায় মামলা হয়।
ঘটনার পর চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের নির্দেশনায় ডিবি ও বাঁশখালী থানা-পুলিশ মাঠে নামে। সহকারী পুলিশ সুপার (আনোয়ারা সার্কেল) মাহমুদুল হাসান এবং ডিবির ওসি মো. মাসুদ রানার নেতৃত্বে একাধিক দল তথ্যপ্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে।
কক্সবাজার সদর, পেকুয়া, উখিয়া, রামু ও টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। ২০ অক্টোবর কক্সবাজার সদর থানার বাস টার্মিনাল, বাংলাবাজার ও কোর্টবাজার এলাকা থেকে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার ভোর চারটার দিকে টেকনাফের লেদা (আলীখালী) রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৫ সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীকে উদ্ধার করা হয়।
অভিযানে অপহরণে ব্যবহৃত একটি ব্যক্তিগত গাড়ি, এসআরবি লেখা পাঁচটি কালো জ্যাকেট, দুটি ভুয়া এসআরবি পরিচয়পত্র ও একটি হ্যান্ডকাফ জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার চাকরিচ্যুত সাবেক সেনাসদস্য সুমন মুন্সি, কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার মিজানুর রহমান, উখিয়ার জয়নাল উদ্দিন, বাঁশখালীর মো. আব্বাস উদ্দিন, টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্প-২৬-এর বাসিন্দা ছলিম ওরফে সেলিম এবং কক্সবাজার সদরের দেলোয়ার হোসেন।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম জানান, সুমন মুন্সি আগে উখিয়া এলাকায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে থাকার সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কয়েকজনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। পরে বিভিন্ন অপরাধে জড়ানোর অভিযোগে তিনি চাকরিচ্যুত হন এবং কারাভোগ করেন। কারাগার থেকে বেরিয়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন এবং ভুয়া এসআরবি পরিচয়ে একটি দল সংগঠিত করেন।
পুলিশের ভাষ্য, দলের কাজের ভাগ ছিল স্পষ্ট। আব্বাস উদ্দিন ও দেলোয়ার হোসেন বিভিন্ন জায়গায় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের গতিবিধি নজরে রেখে সুমনকে তথ্য দিতেন। এরপর সুমন ও তাঁর সহযোগীরা ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপহরণ করতেন এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেন।
পুলিশ জানায়, সুমন মুন্সির বিরুদ্ধে ছিনতাই, দস্যুতা ও অস্ত্র আইনে মোট ১৩টি মামলা রয়েছে। জয়নাল উদ্দিন ওরফে জুনুর বিরুদ্ধে অপহরণ, চুরি ও ছিনতাইয়ের তিনটি মামলা আছে। ছলিম ওরফে সেলিমের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দুটি এবং আব্বাস উদ্দিনের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা রয়েছে।
এই ঘটনা দেখাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পোশাক ও পরিচয়পত্র নকল করে অপরাধ করার প্রবণতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষ বা ব্যবসায়ীরা সহজেই এমন পরিচয়ে বিভ্রান্ত হতে পারেন। একই সঙ্গে সাবেক বাহিনী সদস্যের প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অপরাধে কাজে লাগানোর বিষয়টিও উদ্বেগজনক। অপহরণের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে আটকে রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ ক্যাম্প এলাকার নিরাপত্তা ও নজরদারির প্রশ্নও সামনে আনছে।
দ্রুত তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে ভুক্তভোগীকে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার পুলিশের জন্য উল্লেখযোগ্য সাফল্য। তবে ভুয়া পরিচয়ে একই ধরনের আরও অপরাধের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং চক্রের বাকি সদস্য রয়েছে কি না, তা তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

