কক্সবাজারের টেকনাফে যৌথ অভিযানে ১০ লাখ ১০ হাজার ৮০০ মিটার নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল জব্দ করা হয়েছে। জব্দ করা জালের আনুমানিক বাজারমূল্য ৩ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে চালানো এই অভিযানের পর জালগুলো আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত টেকনাফ পৌরসভার লামার বাজারের বিভিন্ন দোকানে এ অভিযান চলে। অভিযান শেষে জব্দ করা জাল কায়ূকখালী খালের পাড়ে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়।
অভিযানে উপজেলা প্রশাসন, টেকনাফ ব্যাটালিয়নের (২ বিজিবি) সদস্য, উপজেলা মৎস্য অধিদপ্তর, টেকনাফ মডেল থানা ও টেকনাফ নৌ পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা অংশ নেন। প্রতিবেদনে অভিযানে কাউকে আটক বা জরিমানা করার তথ্য উল্লেখ নেই।
অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পথে মিয়ানমার থেকে কারেন্ট জাল টেকনাফে ঢুকছে। পরে সেগুলো বিভিন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে সাগর ও নাফ নদীতে মাছ ধরার কাজেও এসব জাল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
কারেন্ট জালের সুতা অত্যন্ত চিকন হওয়ায় এতে পোনা মাছ থেকে শুরু করে ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আটকা পড়ে। এর ফলে মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। দীর্ঘ মেয়াদে নদী ও সাগরে মাছের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
লামার বাজারে এত বড় পরিমাণ জাল জব্দের পর স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বাজারেই নয়, টেকনাফের বিভিন্ন বোটঘাট ও মাছ ধরার নৌযানেও এসব জাল মজুত ও ব্যবহার করা হচ্ছে।
তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী, টেকনাফ পৌরসভার কায়ূকখালী বোটঘাট, নাইট্যংপাড়া, মহেষখালীয়া পাড়া, তুলাতলী, লম্বরী, রাজারছড়া, হাবিবছড়া ও মিঠাপানিরছড়া এলাকার বিভিন্ন মাছ ধরার বোটে কারেন্ট জাল রয়েছে। শাহপরীরদ্বীপের মিস্ত্রি পাড়া, ঘোলাচর, পশ্চিম পাড়া, সাদীরপাড়া ও দক্ষিণপাড়া এলাকায়ও এমন জাল ব্যবহারের অভিযোগ আছে। এ ছাড়া বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালী পাড়া, শীলখালী, বড় ডেইল, কচ্ছপিয়া ও মাথাভাঙ্গা এবং সাবরাং ইউনিয়নের কাটাবনিয়া, বাহারছড়া, খুরেরমুক ও মুন্ডার ডেইল নৌঘাটের বোটেও কারেন্ট জাল ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগ যাচাই করা হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
স্থানীয় জেলেরা বলছেন, বাজার ও দোকানে অভিযান চালিয়ে জাল জব্দ করা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে এর ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। তাঁদের মতে, সাগর ও নাফ নদীতে মাছ ধরার বোটগুলোতেও নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। যেসব বোটে এ ধরনের জাল মজুত বা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো শনাক্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তাঁদের। পাশাপাশি অবৈধ জালের সরবরাহকারী, বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলছেন তাঁরা।
টেকনাফ নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. আতিকুর হক জানান, যৌথ বাহিনীর অভিযান চলমান আছে। টেকনাফের সব নৌঘাটে মাছ ধরার বোটে নিষিদ্ধ জাল আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। জাল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে বলে তিনি জানান।
উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. জহরুল হক জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অবৈধ কারেন্ট জালের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই অভিযানের গুরুত্ব কেবল জব্দ করা জালের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। ১০ লাখ মিটারের বেশি জাল একসঙ্গে পাওয়া গেলে বোঝা যায়, এর সরবরাহ ব্যবস্থা বেশ বড় পরিসরে সক্রিয়। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় মিয়ানমার থেকে অবৈধ পথে জাল ঢোকার বিষয়টি নজরদারির দুর্বলতাও সামনে আনে।
তবে একটি অভিযানেই সমস্যার সমাধান হবে, এমন আশা করা কঠিন। জেলেদের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, চাহিদা ও ব্যবহার যতদিন থাকবে, ততদিন সরবরাহও চলতে থাকার ঝুঁকি রয়েছে। তাই কেবল জাল জব্দ ও ধ্বংস নয়, উৎস শনাক্ত, সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মাছ টেকনাফের অনেক পরিবারের জীবিকার অন্যতম উৎস। কারেন্ট জালের কারণে পোনা মাছ নিধন হলে ভবিষ্যতে এই জীবিকাই হুমকির মুখে পড়তে পারে। ফলে মৎস্যসম্পদ রক্ষা শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গেও জড়িত।এখন নজর রয়েছে পরবর্তী অভিযানের দিকে। প্রশাসন ও যৌথ বাহিনী নৌঘাট ও মাছ ধরার বোটে অভিযান চালায় কি না এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তার ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে এই উদ্যোগের কার্যকারিতা।

