যুক্তরাজ্যে সম্পত্তি কেনার ক্ষেত্রে পুরো অর্থ নগদ পরিশোধের সুযোগ নেই। সাধারণত সম্পত্তি ক্রেতারা প্রথমে আংশিক অর্থ পরিশোধ করেন। বাকি অর্থ ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণের মাধ্যমে শোধ করেন। এ ঋণের বিপরীতে বন্ধক (চার্জ) নিবন্ধিত হয়। ঋণ শোধ সম্পন্ন হলে তা বন্ধ করার প্রক্রিয়া হয়, যা ‘স্যাটিসফ্যাকশন অব চার্জ’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার মালিকানাধীন দুই প্রতিষ্ঠান- জেডটিএস প্রপার্টিজ লিমিটেড ও রুখমিলা প্রপার্টিজ লিমিটেড- মাত্র দুই মাসে যুক্তরাজ্যের ১৯৯টি প্রপার্টির ঋণ পরিশোধ করেছে। এই দ্রুত ঋণ নিষ্পত্তি ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
অস্বাভাবিক ঋণ পরিশোধের ঘটনা-
২১ আগস্ট থেকে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে প্রতিষ্ঠান দুটি বিপুল পরিমাণ ঋণ শোধ করেছে। সরকারি নথি অনুযায়ী, জেডটিএস প্রপার্টিজ ১১১টি এবং রুখমিলা প্রপার্টিজ ৮৪টি প্রপার্টির ঋণ শোধ করেছে। এসব ঋণের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ডিবিএস ব্যাংক, মার্কারি ফান্ডিং লিমিটেড, নেপচুন ফান্ডিং লিমিটেড, আর্থেইভ ব্রিজিং লিমিটেড প্রভৃতি।
এত কম সময়ে এতগুলো ঋণ পরিশোধকে আর্থিক বিশ্লেষকরা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন। দীর্ঘদিন বন্ধকি ঋণ বহাল থাকলেও হঠাৎ সরকারের পতনের পর এই অর্থ পরিশোধের ঘটনা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।
অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন-
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর ৫০০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ৩৬০টি সম্পত্তি রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর মাত্র দুই মাসে এত বিপুল ঋণ পরিশোধের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ অর্থ কোথা থেকে এসেছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। স্কয়ার মাইলস সলিসিটরের পরিচালক ফজলে ইলাহী বলেন, “এত বড় অঙ্কের অর্থ একবারে পরিশোধ করা সন্দেহজনক। এ অর্থ অবৈধ কিনা এবং কীভাবে এটি অর্জিত হয়েছে, তা তদন্ত হওয়া উচিত।”
আন্তর্জাতিক সম্পদের বিস্তার-
অন্যদিকে আল জাজিরার রিসার্চ অ্যানালিস্ট জুলকারনাইন শায়ের সামি বলেন, “সাইফুজ্জামান চৌধুরীর সম্পদের পরিমাণ তার ঘোষিত আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি ও তার পরিবার শেল কোম্পানির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে বিপুল সম্পত্তি কিনেছেন। এর অনেকগুলোর তথ্য আয়কর রিটার্ন বা নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখ নেই।”
বাংলাদেশ পুলিশের সিআইডি জানিয়েছে, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও দুবাইয়ে ৬২০টি সম্পত্তি কিনেছেন। এর বাজারমূল্য প্রায় ৪৮ কোটি ডলার। তবে এই বিপুল সম্পদের কোনো তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বা সরকারের নথিতে পাওয়া যায়নি।
তদন্তের আওতায় সম্পত্তি ও অর্থায়ন-
গণ-অভ্যুত্থানের পর সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও দুবাইয়ে এসব সম্পত্তি নিয়ে বাংলাদেশের সিআইডি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তদন্ত শুরু করেছে।
মাত্র দুই মাসে এতগুলো ঋণ পরিশোধের ঘটনা সন্দেহজনক এবং এর অর্থায়নের উৎস খুঁজে বের করা জরুরি। এটি শুধু আর্থিক নয় বরং রাজনৈতিক ইস্যুতেও পরিণত হয়েছে। সাইফুজ্জামান চৌধুরী এবং তার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা উন্মোচিত হলে তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও আইনি কাঠামোয় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সম্পদ এবং অর্থায়নের প্রশ্নে সঠিক তদন্তই দিতে পারে সব রহস্যের জবাব।

