ঢাকার যানজট এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার অদক্ষতা এখন কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয় বরং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অন্যতম বড় বাধা। মাত্র দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঢাকার বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হলেও, অতীতের সরকারগুলো সেই উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশৃঙ্খল পরিবহনব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের দীর্ঘদিনের হতাশা সত্ত্বেও বর্তমান বাস্তবতা বলছে, এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন বহুমুখী ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ।
বাসে শৃঙ্খলা ফেরানোর প্রাথমিক পরিকল্পনা ও ব্যর্থতা-
ঢাকার বাস ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ২০১৫ সালে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক উদ্যোগ নেন। তাঁর পরিকল্পনা ছিল সব বাস অল্প কয়েকটি কোম্পানির অধীনে আনা। এতে প্রতিটি মালিক বিনিয়োগের হার অনুযায়ী লভ্যাংশ পেতেন এবং বাসগুলোর রঙ ও সময়সূচি একীভূত থাকত। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে যাত্রীদের টানাটানি, বাসের এলোমেলো চলাচল এবং পথে বাস দাঁড় করানোর বিশৃঙ্খলা দূর করার কথা ছিল।
আনিসুল হক অনেক বৈঠক করলেও, তাঁর মৃত্যুতে উদ্যোগটি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন এবং শেখ ফজলে নূর তাপস কিছু পদক্ষেপ নিলেও কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। দক্ষিণ সিটির মেয়র তাপস এবং উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম ২০২১ সালে ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে একটি রুট চালু করেন। তবে সেই রুটও কার্যকর অবস্থায় নেই।
মূলত, পরিবহন খাতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্টদের কারণে এই উদ্যোগ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অসহযোগিতার পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকারে বড় ব্যয়ের মেগা প্রকল্পের প্রতি বেশি মনোযোগ ছিল।
মেগা প্রকল্পের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ-
পূর্ববর্তী সরকার ঢাকার পরিবহন খাতে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল, উড়ালসড়ক এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি)। এসব প্রকল্পের মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ আংশিক চালু হয়েছে এবং বাকিগুলো বাস্তবায়নাধীন। তবে এই প্রকল্পগুলো নির্মাণকালীন সময়েও মানুষকে যানজটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি দিতে পারেনি।
বুয়েটের অধ্যাপক ও পরিবহনবিশেষজ্ঞ সামছুল হকের মতে, সব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও ঢাকার ২০ শতাংশ যাতায়াত চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। অথচ ঢাকার ৭২ শতাংশ গণপরিবহন যাত্রা বাস-মিনিবাসে হয়। তাই বাস ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে না পারলে, মেগা প্রকল্পের সুফলও পুরোপুরি পাওয়া যাবে না।
বাস শৃঙ্খলার গুরুত্ব ও সম্ভাবনা-
ঢাকার গণপরিবহন খাতে বর্তমানে প্রায় চার হাজার বাস-মিনিবাস রয়েছে, যার বেশিরভাগই জরাজীর্ণ। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং শৃঙ্খলার অভাবে এই বাসগুলো নাগরিকদের কাছে এক ধরনের বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব। এতে কম বিনিয়োগে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। দুই হাজার কোটি টাকার স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে পরিবহন মালিকদের নতুন বাস কিনতে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এছাড়া একটি পেশাদার নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে কার্যক্রম পরিচালিত হলে দুর্নীতি কমানো সম্ভব।
চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব-
প্রথম আলোর অনুসন্ধান অনুযায়ী, ঢাকাসহ সারা দেশের যানবাহন খাত থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। বড় বাস কোম্পানির ৯২ শতাংশ পরিচালনার সঙ্গে রাজনীতিবিদদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা এসব চাঁদাবাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
পরিবহন মালিক সমিতির বর্তমান বিএনপিপন্থী আহ্বায়ক সাইফুল আলম জানান, শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের যেকোনো উদ্যোগে তাঁরা সমর্থন জানাবেন। তবে এই ধরনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদারকি।
অবকাঠামো নয়, ব্যবস্থাপনার সংকট-
ঢাকার যানজট সমস্যার মূল সমাধান কোনো মেগা প্রকল্প নয় বরং বিদ্যমান বাস ব্যবস্থার উন্নয়ন। নতুন বাস চালু করা, রুট একীভূত করা এবং একটি সমন্বিত পরিবহন নীতি গ্রহণ করা জরুরি। মেট্রোরেল এবং বিআরটি প্রকল্পের সুফল পেতে হলেও বাসের শৃঙ্খলা আনা ছাড়া তা সম্ভব নয়।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন পরিকল্পনা ইতিবাচক দিক নির্দেশনা হতে পারে। তবে আগের ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে, ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা তার চিরাচরিত বিশৃঙ্খল অবস্থাতেই থেকে যাবে।
ঢাকার যানজট নিরসনে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন যথেষ্ট নয়। পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক তদারকি জরুরি। রাজধানীর বাস ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে কেবল ঢাকার নাগরিকদের জীবনযাত্রা সহজ হবে না বরং দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

