বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি যেন এক অচলায়তন। ভোজ্যতেল থেকে চিনি, আলু থেকে পেঁয়াজ-প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো পণ্যের অপ্রাপ্তি ভোক্তাদের জন্য দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের মূলে রয়েছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি এবং বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য।
সম্প্রতি খোলাবাজারে বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকট ভোক্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। শুক্রবার রাজধানী ঢাকা এবং দেশের বিভিন্ন জেলায় অনেকেই অতিরিক্ত দাম দিয়েও তেল কিনতে পারেননি। ধারণা করা হচ্ছে, আসন্ন রমজান মাসকে সামনে রেখে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী তেলের বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পুরোনো সিন্ডিকেট আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা মিল পর্যায়ে তেলের সরবরাহ কমিয়ে ডিলারদের কাছে পণ্য পাঠাচ্ছে সীমিত পরিমাণে। এই পরিস্থিতিতে খুচরা বিক্রেতারা যথাযথ সরবরাহ না পেয়ে হিমশিম খাচ্ছেন, আর ভোক্তারা বাধ্য হচ্ছেন অতিরিক্ত দাম দিতে।
এ সংকট শুধু ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ভরা মৌসুমেও আলু এবং পেঁয়াজের চড়া দাম ভোক্তাদের কষ্ট বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ডিমের বাজারে অস্থিরতা বিষয়টিও বহুল আলোচিত। রমজান শুরুর কয়েক মাস আগেই ছোলা, চিনি, ভোজ্যতেলসহ পণ্যের দাম বৃদ্ধির প্রবণতা অসাধু ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত কৌশল।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ-
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষকে ভোগান্তির চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিশেষত, গত তিন বছর ধরে টানা উচ্চমূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে সংকটময় করে তুলেছে।
মূল্যস্ফীতির এই পরিস্থিতি তৈরির পেছনে বিগত সরকারের ভুল নীতি, অর্থ পাচার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার মতো বিষয়গুলোকে দায়ী করছেন অর্থনীতিবিদরা। চলতি বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে সাধারণ মানুষ আশা করেছিল যে, বাজারে স্বস্তি ফিরবে। তবে বাস্তবে সেই আশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলেও বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের অধিক মুনাফার প্রবণতা এই প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও সমাধানের উপায়-
বাজারের এই অস্থিরতা দূর করতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের শক্ত হাতে দমন করা ছাড়া এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। অতীতে ভোজ্যতেল মজুতের কারণে জরিমানা করেও কারসাজি থামানো যায়নি। বরং যারা এই কারসাজি চালায়, তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষকে অত্যন্ত তৎপর হতে হবে। রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজার যাতে অস্থিতিশীল না হয়, তা নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি। একই সঙ্গে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
আমরা অতীতে দেখেছি, আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা বারবার পার পেয়ে গেছে। এবার কর্তৃপক্ষ যদি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়, তাহলে নিত্যপণ্যের বাজারে সংকট আরও প্রকট হবে। এতে ভোক্তারা আরও চরম দুর্ভোগে পড়বে, আর বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে উঠবে।
ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান-সময় থাকতেই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। বাজারে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনুন এবং অসাধু কারসাজির চক্র ভেঙে দিন।

