দক্ষিণ-পূর্ব চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল বাংলাদেশের প্রথম আন্ডারওয়াটার টানেল। চট্টগ্রাম শহরের পতেঙ্গা ও আনোয়ারা উপজেলাকে সংযুক্ত করা এই প্রকল্প উদ্বোধনের সময় দেশজুড়ে আলোচিত ছিল। তবে সময়ের সাথে প্রকল্পটি ব্যয়বহুল ‘সাদা হাতি’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
ব্যয় ও আয়: বিপুল পার্থক্য-
কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ ব্যয় প্রায় ১০ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা, যার একটি বড় অংশ বৈদেশিক ঋণ। কিন্তু টানেলটি থেকে আয় এখনো প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, টানেলের দৈনিক পরিচালন ব্যয় ৩৭.৪৪ লাখ টাকা। অথচ টোল থেকে দৈনিক আয় মাত্র ১০.৫০ লাখ টাকা। ফলে প্রতিদিন গড়ে ২৬.৯৪ লাখ টাকা লোকসান গুনছে সরকার।
২০২২ সালের ২৮ অক্টোবর উদ্বোধনের পর থেকে ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত টানেল দিয়ে যাতায়াত করেছে প্রায় ১৪.৯৭ লাখ যানবাহন। এ সময়ে টানেল থেকে মোট আয় হয়েছে ৪০.৯ কোটি টাকা, যা প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সম্ভাব্যতা সমীক্ষার যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই এত ব্যয়বহুল একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে সরকারের ঋণ বেড়েছে এবং উন্নয়নের স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
৪৫০ কোটি টাকার ‘অব্যবহৃত’ রিসোর্ট-
টানেল প্রকল্পের একটি অংশ হিসেবে আনোয়ারা উপজেলার পারকি বিচের কাছে নির্মিত হয়েছে ৪৫০ কোটি টাকার রেস্ট হাউস, যা ২০২৪ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হয়।
রেস্ট হাউসটিতে রয়েছে ৩০টি বাংলো, যার মধ্যে একটি ভিভিআইপি বাংলো সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি করা হয়।

তবে উদ্বোধনের ছয় মাস পার হলেও রিসোর্টটি এখনো জনসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি। সার্ভিস এরিয়ার বাংলোগুলো আনসার ব্যাটালিয়নের প্রহরায় রয়েছে। মাঝে মাঝে সেতু কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলেও অধিকাংশ সময় রিসোর্টটি ফাঁকা থাকে।
সেতু বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই ভিভিআইপি বাংলোটি তৈরি করা হয়। তবে এখন সরকার এই রিসোর্টটি বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।”
নাগরিক সমাজের সমালোচনা-
স্থানীয়রা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি প্রকল্পটিকে অযৌক্তিক ও অর্থ লোপাটের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম বলেন, “টানেলটি মিরসরাই থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ হাইওয়ের সাথে যুক্ত হলে ভবিষ্যতে কার্যকর হতে পারে। তবে ৪৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রিসোর্টটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়। এটি শুধু টাকা লুটপাটের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার হয়েছে।”
রিসোর্টের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন-জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মৎস্য চাষ ও পশুপালন করে জীবিকা নির্বাহ করা অন্তত ২০০ পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান এখনো নিশ্চিত হয়নি।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন-
২০১৩ সালে চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) পরিচালিত সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, টানেলটি চালুর প্রথম বছরে দৈনিক গড়ে ১৭ হাজার ৩৭৪টি যানবাহন চলবে। কিন্তু ২০২৩ সালে এই সংখ্যা মাত্র ৪ হাজার এরও কম।
বিশেষজ্ঞরা সমীক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, “অনেক কম ব্যয়ে একটি সাসপেনশন ব্রিজ নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। অথচ ব্যয়বহুল এবং কম কার্যকর একটি প্রকল্পকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম আন্ডারওয়াটার টানেল হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।”
উন্নয়ন না অর্থনৈতিক বোঝা?
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পকে ঘিরে সরকার বড় প্রত্যাশা দেখালেও বাস্তবে এটি ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন অনেকে। ব্যয়বহুল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

