বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে অস্বচ্ছ ঋণ বিতরণের অনিয়মের তালিকা দীর্ঘ হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আইএফআইসি ব্যাংকের বিতর্কিত কার্যক্রম দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। এমনই এক নজিরবিহীন ঘটনা উঠে এসেছে ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের’ প্রতিবেদনে, যেখানে নবীন কোম্পানিগুলো নিবন্ধনের কয়েকদিনের মধ্যেই শত শত কোটি টাকা ঋণ পেয়ে গেছে। এই আর্থিক কার্যক্রমের পেছনে উঠে এসেছে শেল কোম্পানির অস্তিত্বহীনতা, অনৈতিক ব্যাংক প্রশাসন এবং প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ।
নর্থস্টোন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের রহস্যময় উত্থান-
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে নিবন্ধিত ‘নর্থস্টোন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড’ কোম্পানির যাত্রা শুরু হয় মাত্র ১০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন দিয়ে। নিবন্ধনের পাঁচ দিনের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ‘আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখায়’ অ্যাকাউন্ট খোলে। এর দুই দিনের মাথায় প্রতিষ্ঠানটি ‘দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে’ ৮০৭ কোটি টাকার সাব-কন্ট্রাক্ট পায় এবং সঙ্গে সঙ্গেই ৪০০ কোটি টাকার ওভারড্রাফ্ট ঋণের জন্য আবেদন করে।
ব্যাংকটি মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ঋণ অনুমোদন দেয়, যদিও ঋণ নেওয়ার আগে নির্ধারিত জমি বন্ধকির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ১২ কার্যদিবসের মধ্যে তারা সম্পূর্ণ অর্থ উত্তোলন করে নেয়।
শেল কোম্পানির জালিয়াতি-
নর্থস্টোনের মতোই ‘সার্ভ কনস্ট্রাকশন’ ২০২০ সালে খুলনার বিদ্যুৎ প্রকল্পের সাব-কন্ট্রাক্ট পাওয়ার দিনেই আইএফআইসি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খোলে এবং এক মাসের মাথায় ৪৩৫ কোটি টাকার ওভারড্রাফ্ট ঋণ পেয়ে যায়। চুক্তি অনুসারে পে-অর্ডারের বদলে তারা বেশিরভাগ অর্থ নগদে তুলে নেয়।
আরেক প্রতিষ্ঠান ‘স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল’ ২০২২ সালের ২৬ জুলাই নিবন্ধনের সাত দিনের মাথায় ৫৪৫ কোটি টাকার ঋণ পায়। তবে তাদের নিবন্ধিত ঠিকানা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কোনো অফিসের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
স্কাইমার্কের মতো আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান, যেমন ‘ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল, গ্লোয়িং কনস্ট্রাকশন’ এবং ‘আলফা এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড’ সবগুলোই গড়ে এক মাসের মধ্যে শত কোটি টাকার ঋণ আদায় করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, অফিসের অস্তিত্ব নেই বা সামান্য এককক্ষের অফিস ব্যবহার করা হয়েছে।
ব্যাংকিং অনিয়মে প্রভাবশালী মহলের হাত-
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এ ধরনের শেল কোম্পানির ঋণ অনুমোদনের পেছনে ব্যাংকের তৎকালীন চেয়ারম্যান ‘সালমান এফ রহমান’ এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলমের ভূমিকা ছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, শেল কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম যাচাই-বাছাই করা হয়নি; বরং চরম উদারতায় ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আইএফআইসি ব্যাংকের অনুরূপ প্রতারণামূলক কার্যক্রমে আরও ১৪টি কোম্পানি জড়িত ছিল, যাদের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ হাজার ১২৯ কোটি টাকায়।
ভিস্তা ইন্টারন্যাশনালের নাটকীয় ঋণ প্রক্রিয়া-
মিরপুরের পশ্চিম কাজীপাড়ার ৭৯৬ হাজী টাওয়ারে নিবন্ধিত ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল মাত্র ৫ হাজার টাকা ভাড়ার ছোট অফিস থেকে ৪৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। ভবনের মালিক জানান, অফিসে মাত্র দুটি চেয়ার ও একটি ছোট টেবিল ছিল। সাত-আট মাস চালানোর পর তারা অফিস বন্ধ করে চলে যায়।
জমির ভুয়া মূল্যায়ন ও অনিয়ম-
এ কোম্পানিগুলোর বেশিরভাগই ঋণের জন্য সম্পত্তি বন্ধক রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধকীকৃত জমির দলিল তৈরি হয়নি। যেমন, কসমস কমোডিটিস লিমিটেড, ফারইস্ট বিজনেস এবং সানস্টার বিজনেস নামে তিনটি কোম্পানি গাজীপুর ও শ্রীপুরে অন্য মালিকানাধীন জমি বন্ধক দেখিয়ে ১ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা ঋণ পেয়েছে।
নতুন প্রশাসনের পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ-
৫ আগস্ট ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় এবং নতুন একটি বোর্ড গঠন করে। বর্তমানে সালমান এফ রহমান অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কারাগারে রয়েছেন।
আইএফআইসি ব্যাংক জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্তাধীন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মনসুর মোস্তফা ও প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক হোসেন শাহ আলী এখনো একই পদে বহাল রয়েছেন।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের এই বিশাল দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতি নয় বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদন্ত ও শৃঙ্খলাজনিত পদক্ষেপই পারে এই বিশৃঙ্খলা রোধ করতে। এ ঘটনার বিচার ও দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাত আবারও জনগণের আস্থার জায়গায় ফিরতে পারে।

