বাংলাদেশের অন্যতম পুরনো ও বৃহৎ রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংক বর্তমানে ইতিহাসের গভীরতম সংকটের মুখোমুখি। ব্যাংকটির মোট ঋণের ৫৫ শতাংশ মাত্র ১০টি শিল্পগ্রুপের কাছে কেন্দ্রীভূত। এসব ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে যাওয়ায় ব্যাংকটি চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) ১ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা লোকসান করেছে।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান সম্প্রতি সরকারের কাছে এক চিঠিতে এ পরিস্থিতিকে “জনতা ব্যাংকের ইতিহাসে সবচেয়ে নাজুক অবস্থা” বলে অভিহিত করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক সভাতেও এই সংকটের গভীরতা তুলে ধরা হয়েছে।
জনতা ব্যাংকের শীর্ষ ১০ ঋণগ্রহীতার মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠানই এখন খেলাপি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
বেক্সিমকো গ্রুপ:
সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন এই গ্রুপটি ১৯৭৮ সালে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করে। ২০২১ সালে গ্রুপটির ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ১৫৩ কোটি টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকায়। গ্রুপটি বর্তমানে শ্রমিকদের বেতন দিতে ব্যাংক থেকে নতুন ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও তারা হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনছে না। সালমান এফ রহমান বর্তমানে কারাগারে থাকায় ঋণ আদায়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
এস আলম গ্রুপ:
এই গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের কাছে ১০ হাজার ১০০ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি। ব্যাংকটি কিছু সম্পত্তি নিলামে তুললেও ঋণ পরিশোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
এননটেক্স গ্রুপ:
কর্ণধার ইউনুছ বাদলের নেতৃত্বাধীন এই গ্রুপের খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।
ক্রিসেন্ট গ্রুপ:
আবদুল কাদের এবং তাঁর ভাই আবদুল আজিজের মালিকানাধীন গ্রুপটি ৩ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি করেছে।
বসুন্ধরা গ্রুপ:
১৯৯৫ সালে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া শুরু করে গ্রুপটি। ২০২৩ সালে তাদের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকায়, যার বেশিরভাগই খেলাপি।
অন্যান্য খেলাপি গ্রুপের মধ্যে রয়েছে থার্মেক্স (১ হাজার ৮৯৮ কোটি টাকা), রানকা (১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা), রতনপুর (১ হাজার ২২৭ কোটি টাকা), শিকদার (৮২৯ কোটি টাকা) এবং গ্লোব জনকণ্ঠ (৮০০ কোটি টাকা)।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা সংকট-
সরকার পরিবর্তনের পর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে নিয়োগ পান মজিবর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, বড় খেলাপিদের ঋণ আদায়ে একটি পথনকশা তৈরি করা হয়েছে, তবে তা বাস্তবায়নে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক রুহুল আমিন বর্তমানে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণ ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত। তিনি বলেছেন- “কারখানাগুলো সাবকন্ট্রাক্টে কাজ শুরু করায় কিছু আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ব্যাংকের লেনদেন স্বাভাবিক হলে ঋণ পরিশোধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
লোকসানের চাপ-
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জনতা ব্যাংকের আমানত ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৬৪২ কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ ৯৮ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬০ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা খেলাপি, যা মোট ঋণের ৬১ শতাংশ। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৯২১ কোটি টাকায়।
ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন ১৮-২০ হাজার কোটি টাকা ধার করে ব্যাংকের কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত-
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন- “সাধারণ মানুষের টাকায় গঠিত ব্যাংকটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে বড় খেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় জরুরি। একইসঙ্গে ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।”
প্রভাবশালী গ্রাহকদের ঋণ খেলাপি ও ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে জনতা ব্যাংক এক গভীর সংকটে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন আইনি কঠোরতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঠিক তদারকি এবং সরকারের নীতি-সমর্থন। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য এই জাতীয়করণ ব্যাংকটির পুনরুজ্জীবন অপরিহার্য।

