খাগড়াছড়ির কয়েকজন ইটভাটা মালিক হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন তাদের কার্যক্রম চালু রাখার জন্য। আদালত তাদের আবেদন সংশ্লিষ্ট পরিবেশগত ছাড়পত্র নির্ধারণে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু এই নির্দেশের পরেই ঘটে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আদালতের আদেশকে বিকৃত করে জালিয়াতির আশ্রয় নেয়া হয়।
জাল আদেশ তৈরির মাধ্যমে ইটভাটার কার্যক্রম চালু রাখতে চেয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট মালিকরা। এতে শুধু আদেশের তারিখ পরিবর্তন নয়, মামলায় সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিদের বাদী করাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে, হাইকোর্টের বিচারপতি ফাতেমা নজিব ও বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজীর বেঞ্চে বিষয়টি প্রকাশ পায়। তারা এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে নির্দেশ দেন।
কীভাবে ধরা পড়লো জালিয়াতি?
রিটকারী আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, ২০২২ সালে তিন পার্বত্য জেলায় (খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙামাটি) অবৈধ ইটভাটা বন্ধের জন্য হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি) একটি রিট দায়ের করেছিল। হাইকোর্ট সেই রিটে তিন জেলার অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু ইটভাটা মালিকরা সেই আদেশকে আংশিক সংশোধন করে কার্যক্রম চালুর অনুমোদন পেয়েছেন বলে দাবি করেন।
সম্প্রতি মনজিল মোরসেদ খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে একটি আদেশের কথা জানতে পারেন। পরে আদেশটি সংগ্রহ করে দেখা যায়, সেটি ভুয়া এবং আদালত থেকে অনুমোদিত নয়। বিষয়টি তিনি হাইকোর্টে উত্থাপন করেন।
জালিয়াতির পদ্ধতি-
জানা গেছে গত ২৬ নভেম্বর হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা জারি করেন, যেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনকে আবেদনকারীদের দেওয়া আবেদন ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই নির্দেশের ভিত্তিতে একটি রুলও জারি হয়। হাইকোর্টের এই আদেশের অনুলিপি ১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। কিন্তু জালিয়াতির মাধ্যমে আদেশের তারিখ পাল্টে ২ ডিসেম্বর উল্লেখ করা হয় এবং ইটভাটা চালুর আদেশ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
মামলার নম্বর এবং জালিয়াতি প্রক্রিয়া-
ইটভাটার কার্যক্রম চালুর জন্য দুটি রিট আবেদন করা হয়, যার নম্বর ১৪৩৬২/২৪ ও ১৪৩৬৩/২৪। দুই রিটের বাদীদের সংখ্যা ছিল ৩২ জন কিন্তু জাল আদেশে সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিদেরও বাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নূর মুহাম্মদ আজমী বলেন, “জালিয়াতি দুইভাবে হয়েছে। প্রথমত, হাইকোর্ট কোনো উৎপাদন চালুর নির্দেশ দেননি। তবুও জাল আদেশে তা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, রিট মামলায় সংশ্লিষ্ট নয় এমন ব্যক্তিদের বাদী করা হয়েছে। এটি গুরুতর অপরাধ।”
আদালতের নির্দেশ ও পরবর্তী পদক্ষেপ-
জালিয়াতি ধরা পড়ার পর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার নির্দেশ দিয়েছেন। বিষয়টি উচ্চ আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া-
আইনজীবী সজল মল্লিক বলেন, “আমার জানা মতে, ২৬ নভেম্বরের আদেশের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রিটকারীরা আদেশ টেম্পারিং করেছেন এবং আমি বিষয়টি ৮ ডিসেম্বর জানতে পেরে আদালতকে অবহিত করেছি।”
হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট যে, আদালতের আদেশের বিকৃতি বা জালিয়াতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্চ আদালত এই ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

