ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) বর্তমানে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে অর্থ তছরুপ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশিক্ষণ ব্যাবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক রিজিয়া সুলতানা। এতদিন শিক্ষক-কর্মচারীরা নীরবে বিষয়টি মেনে নিলেও এখন তা প্রকাশ্য বিরোধ ও প্রতিরোধে রূপ নিচ্ছে।
গত বুধবার শিক্ষকদের সঙ্গে একটি জরুরি অভ্যন্তরীণ বৈঠকে তীব্র বাকবিতণ্ডা, হট্টগোল ও বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। বৈঠকে একজন শিক্ষক সরাসরি অধ্যক্ষকে উদ্দেশ করে বলেন, “শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করবেন না। আপনার অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে। এগুলো বন্ধ না করলে আপনাকে আমরা প্রিন্সিপাল হিসেবে মানব না।” পাল্টা জবাবে অধ্যক্ষ বলেন, “আপনি একজন প্রিন্সিপালকে এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। আপনাকে দেখে নেব।” বৈঠকে এক শিক্ষক প্রশিক্ষণার্থীদের নিম্নমানের খাবার প্রসঙ্গে অভিযোগ তুলে বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই এই সমস্যাটি চলে আসছে।” উত্তরে অধ্যক্ষ দাবি করেন, খাবারের মান যথাযথ এবং তিনি নিজেও সেই খাবার খান। তার মতে, মান নিয়ে অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং কোনো প্রশিক্ষণার্থীও এমন অভিযোগ তোলেননি।
তথ্য অনুযায়ী, অধ্যাপক রিজিয়া সুলতানা ২০২৩ সালের ৯ জুলাই কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দেন। এরপর থেকেই তিনি বিধিবহির্ভূতভাবে কলেজের বিজ্ঞান উন্নয়ন হোস্টেলের দ্বিতীয় তলার দুটি কক্ষে নামমাত্র ভাড়ায় বসবাস করছেন যেখানে সাধারণত প্রশিক্ষণ নিতে আসা শিক্ষকদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। অথচ তার জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি কোয়ার্টারে এখনো অবস্থান করছেন সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম ফারুক যিনি এক বছর আগে অবসরে গেছেন। জানা গেছে, তার কাছ থেকে নিয়মিত ভাড়া গ্রহণ করছেন বর্তমান অধ্যক্ষ।
এর আগেও কুমিল্লার সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজে অধ্যক্ষ থাকা অবস্থায় অধ্যাপক রিজিয়া সুলতানা অনিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য বরাদ্দ পাঁচটি কক্ষ নিজের জন্য ব্যবহার করেছেন এবং সেখানে দুই বছর ধরে অবস্থান করেন।
অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের দাবি, সম্প্রতি কলেজের মূল গেইট ও বাউন্ডারি নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ঠিকাদারের কাছে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন অধ্যক্ষ। শুধু তাই নয় কলেজের অন্তত ৩৪টি অভ্যন্তরীণ কমিটির বাজেট থেকেও তার জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে এসব ব্যয় দেখিয়ে হিসাব সমন্বয় করেন যেখানে অধ্যক্ষ নিজেই স্বাক্ষর করেন। কলেজের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ১৮ হাজার বর্গফুট জায়গায় টাইলস বসানোর কথা থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৫ হাজার বর্গফুট জায়গার কাজ অসম্পন্ন রয়েছে যা অর্থ তছরুপের ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে পরিবহন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। বিটিটি ও এইচআইটি/এএইচআইটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অধ্যক্ষ নিজের নাম রিসোর্স পারসন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন, কিন্তু সেশন নেন না। অন্য কর্মকর্তারা ক্লাস নিলেও সম্মানীর অর্থ গ্রহণ করেন অধ্যক্ষ নিজেই। এমনকি, ১ থেকে ৬ মার্চ পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণের মূল্যায়ন ফর্মে তার বিপরীতে লেখা হয়েছে, “She has not conducted any session”।
খাদ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এতে প্রশিক্ষণ নিতে আসা শিক্ষকদের জন্য সরবরাহকৃত খাবারের মান গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সর্বশেষ গত রমজানে (১০ মার্চ) পরিচালিত এক প্রশিক্ষণ চলাকালে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা নিম্নমানের খাবার সরবরাহের অভিযোগ এনে লিখিতভাবে প্রতিবাদ জানান। একপর্যায়ে অধ্যক্ষ নিজে প্রতিটি কক্ষে গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং খাবারের মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। তবুও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় প্রশিক্ষণার্থীরা খাবারের পরিবর্তে বরাদ্দকৃত অর্থ নগদভাবে পাওয়ার দাবি তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা কমিটির হলেও অধ্যক্ষ নিজেই সরাসরি ‘ফুডিং’ কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
আরো অভিযোগ রয়েছে, ৩০তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত কলেজের এক শিক্ষক ‘বিশেষ আনুকূল্য’ পাওয়ার বিনিময়ে অধ্যক্ষের অনিয়মে সহযোগী ভূমিকা রাখছেন। একই শিক্ষক পূর্বে অধ্যাপক কানিজ সৈয়দা বিনতে সাবার আমলেও অনিয়মে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে এ সংক্রান্ত একটি দুর্নীতি মামলা দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তাধীন রয়েছে এবং নিয়মিত হাজিরা দিতে হচ্ছে তাকে।
এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ অধ্যাপক রিজিয়া সুলতানা ইত্তেফাক-কে জানান, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। প্রশিক্ষণার্থীদের হোস্টেলে বসবাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তার কোয়ার্টারে পিআরএলে থাকা সাবেক অধ্যক্ষ থাকছেন, যিনি বর্তমানে অসুস্থ এবং যার পিআরএলের মেয়াদ ৩০ জুন পর্যন্ত। মাউশির সংশ্লিষ্ট বিভাগ বিষয়টি জানে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। হোস্টেলে তিনি নিয়ম মেনেই সিট ভাড়া দিয়ে থাকেন।
ঠিকাদারের কাছে ঘুষ দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি বলেন, এটি ভিত্তিহীন। একইভাবে, খাবারের মান নিয়েও তার বক্তব্য, প্রশিক্ষণার্থীদের দেওয়া খাবার ছিল যথাযথ মানসম্পন্ন।
বুধবারের বৈঠকে উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ বলেন, বৈঠকটি তিনি নিজেই আহ্বান করেছিলেন এবং সেখানে উত্তপ্ত কোনো বাক্য বিনিময়ের ঘটনা ঘটেনি।
সরকারি একটি শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ শিক্ষা প্রশাসনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগের তদন্ত করে কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার জন্য কী পদক্ষেপ নেয়।

