২০১৭ সালের ১৫ মার্চ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ঘটে একটি ভয়াবহ ঘটনা। সরকার বলেছিল, এটি ছিল একটি ‘জঙ্গি’ আস্তানায় অভিযান। কিন্তু পরে জানা যায়, এটি ছিল সাজানো এক নির্মম নাটক।
ঘটনাটি ছিল এক পরিবারের মৃত্যু। নিহত হয় পাঁচজন। তিনজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেলেও বাকি দুজনের নাম জানা যায় শুধু মামলার কাগজে। তাদের ঠিকানা আজও অজানা।
সে সময়, মার্চ মাসজুড়ে দেশে জঙ্গি অভিযানের ঢল নামে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকায় অভিযান চলছিল। একই ধরনের কৌশল—বাড়ি ঘিরে ফেলা, ফাঁকা গুলি, হুমকি, আর শেষে হঠাৎ বিস্ফোরণ। নিহতরা ‘জঙ্গি’ বলেই পরিচিতি পেত। পুলিশের দাবি থাকত, তাদের সদস্যরাও আহত হয়েছেন। কিন্তু কারা আহত, তা কখনোই পরিষ্কার হতো না।
সীতাকুণ্ডের চৌধুরীপাড়ার ‘ছায়ানীড়’ ভবনকে কেন্দ্র করে ঘটে তেমনই একটি ঘটনা। জেলা পুলিশের তথ্য ছিল, সেখানে ‘জঙ্গি’ অবস্থান করছে। সাংবাদিকরা ছুটে যান কিন্তু ঢুকতে দেওয়া হয়নি। বলা হয়, ভবনে অনেক বিস্ফোরক আছে। বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
হ্যান্ড মাইকে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। সারা রাত পুলিশের অবস্থান। র্যাব সদস্যরাও মোতায়েন হয়। কালো গ্লাসের গাড়ি এলাকা ঘিরে ঘুরতে থাকে।
পরদিন সকালে দ্বিতীয় তলার সিঁড়িঘরে ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ। পাঁচজন নিহত হন—এক নারী, এক শিশু ও তিনজন পুরুষ। পরে জানা যায়, তারা হলেন বান্দরবানের কামাল হোসেন, তার স্ত্রী জোবাইদা বেগম ও তাদের ছয় মাসের সন্তান সৃজন। বাকি দুজনের নাম দেওয়া হয় রাশেদ ও হৃদয়। কিন্তু তাদের প্রকৃত পরিচয় আজও জানা যায়নি। অজ্ঞাতনামা হিসেবে দাফন করা হয়।
সীতাকুণ্ড প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রথম অভিযান হয়েছিল ‘ছায়ানীড়’ থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে, আমীরাবাদ এলাকার সাধন কুটিরে। সেখানে ধরা হয় এক দম্পতি ও একটি শিশুকে। এরপরই ঘিরে ফেলা হয় ছায়ানীড়।
সাংবাদিকদের মতে, দুটি অভিযান হয়েছিল মাত্র ১০-১৫ মিনিটের ব্যবধানে। চট্টগ্রাম পুলিশ লাইন থেকে এত দ্রুত এত ফোর্স সেখানে পৌঁছাল কিভাবে, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
পরদিন ভোরে, ঠিক সোয়া ৬টার দিকে ছায়ানীড়ে ঘটে বিস্ফোরণ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, সোয়াত সদস্যরা পাশের ভবন থেকে ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা আত্মঘাতী বিস্ফোরণ ঘটায়।
ভবনের সামনে থাকা মুদি দোকানি মাহবুবুল করিম জানান, দুই মাস আগে এক পরিবার সেখানে ফ্ল্যাট নিয়েছিল। যুবক, তার স্ত্রী ও এক শিশু। তারা মাঝে মাঝে তার দোকান থেকে বাজার করত। কিন্তু বিস্ফোরণের পর মৃতদেহ দেখে তিনি বলেন, সেটি ওই যুবক নয়।
এই বক্তব্য দেন আরেক বাসিন্দা আজাদ চৌধুরীও। তার দাবি, নিহতদের চেহারা ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে মেলে না। এলাকায় গুঞ্জন ছিল, কালো গ্লাসের গাড়িতে লাশ আনা হয়েছে। ভাড়াটিয়া পরিবারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলেনি।
ভবনের মালিক অলিউল্লাহর স্ত্রী রেহানা বেগম বলেন, পুলিশ তাদের ভাড়াটিয়াদের ফ্ল্যাট চিহ্নিত করে দরজায় ধাক্কা দেয়। হঠাৎ বিস্ফোরণ হলে তিনি জানালা দিয়ে দেখেন, পুরো ভবন ঘিরে ফেলা হয়েছে। পরে তিনি বাইরে যেতে চাইলে পুলিশ গুলি ছোড়ে। আবার তাকে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়।
পরদিন সকালে তার ফ্ল্যাটের সামনেই ঘটে বিকট বিস্ফোরণ। তিনি জানান, নিচতলার বাসায় কোনো শব্দ শোনা যেত না। বিস্ফোরণের এক ঘণ্টা পর তাকে বের করে থানায় নেওয়া হয়। তিনি পাঁচটি ছিন্নভিন্ন লাশ দেখেন। শিশুটির মরদেহ ছিল একটি মেয়ের। অথচ যাদের তিনি চিনতেন, তাদের সন্তান ছিল ছেলে। পুলিশকে জিজ্ঞেস করলে জানায়, জঙ্গিরা বাসা বদল করেছে।
পুলিশ জানায়, সাধন কুটির থেকে ধরা জহিরুল হক ও তার স্ত্রী আরজিনার স্বীকারোক্তিতে ছায়ানীড় অভিযানের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু সাংবাদিকরা বলছেন, দুটি অভিযান হয়েছিল মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে। এত তাড়াতাড়ি একজন কীভাবে সহযোগীদের ঠিকানা জানাবে?
পুলিশ দাবি করে, জহিরুল ও আরজিনা ছিলেন ‘নব্য জেএমবির’ সদস্য। তাদের আসল নাম ছিল জসিম উদ্দিন ও রাজিয়া সুলতানা। তবে এলাকায় তারা জহিরুল ও আরজিনা নামেই পরিচিত ছিলেন।
তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। যার মধ্যে রয়েছে সিলেটের আতিয়া মহল হামলার অভিযোগও। আট বছর জেলে ছিলেন আরজিনা ও তার ছেলে জোবায়ের। মাত্র ছয় মাস বয়সে সে মায়ের সঙ্গে কারাগারে যায়। তার শৈশব কাটে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে।
বর্তমানে তারা নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারীতে থাকেন। সেখানে কথা হয় পরিবারের সঙ্গে। আরজিনার বড় ভাই জিয়াবুল হক জানান, একসময় জহিরুল বাইশারী বাজারে পান দোকান চালাতেন। পরে ভালো জীবনের আশায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে চট্টগ্রাম যান। তারপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০১৭ সালের ১৭ মার্চ, জিয়াবুল হক বাইশারী তদন্ত কেন্দ্রে গিয়ে ঘটনার কথা জানাতে চান। এরপর কী হয়েছিল, কেউ জানে না।
আজও ছায়ানীড়ের সেই ঘটনা রহস্যে মোড়া। একটি পরিবার নিখোঁজ হয়ে গেল, আর তার দায় চাপানো হলো ‘জঙ্গি’ তকমায়। সেই প্রশ্নের উত্তর আজও অজানা। কেউ খুঁজেও দেখেনি।

