ছাত্রদলের মাধ্যমে রাজনীতিতে পা রাখা মহিউদ্দীন মহারাজ পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই সূত্রেই রাজনীতির মাঠে সরাসরি সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। তবে রাজনৈতিক সম্পর্কের জটিলতায় একসময় জাতীয় পার্টি ছাড়েন এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছায়ায় আশ্রয় নেন।
‘সোনার নৌকা’ নিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েই পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। ধাপে ধাপে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন জনপ্রতিনিধি হিসেবে। জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হন এবং ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাতবারের সংসদ সদস্য আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে হারিয়ে পিরোজপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
বহুমাত্রিক এই রাজনৈতিক যাত্রার আড়ালে ছিল আরেকটি পরিচয়—ঠিকাদার। তাঁর নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে ছিল একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। বাইরে জনপ্রতিনিধি, ভেতরে ছিল সরকারি প্রকল্পের অর্থে গড়ে ওঠা ঠিকাদারির সাম্রাজ্য। মহিউদ্দীন মহারাজ বর্তমানে পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তাঁর ভাই মিরাজুল ইসলাম ভাণ্ডারিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন, সেজো ভাই মো. সামসুদ্দিন ছিলেন তেলিখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ছোট ভাই মো. সালাউদ্দিনও যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। শুধু পুরুষ সদস্যরাই নয় মিরাজুলের স্ত্রী শামীমা আক্তারও রাজনীতির পাশাপাশি প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার হিসেবে নাম কামিয়েছেন।
এই পরিবারটির ছয়টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১২৮টি সেতু নির্মাণের জন্য প্রায় ২৩৬ কোটি টাকার কার্যাদেশ দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো: মহারাজের সেসার্স হরিণপালা ট্রেডার্স, মিরাজুল ইসলামের ইফতি ইটিসিএল (প্রা.) লিমিটেড ও সাউথ বাংলা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, শামীমা আক্তারের মেসার্স শিমু এন্টারপ্রাইজ, সামসুদ্দিনের তেলিখালী কনস্ট্রাকশন এবং সালাউদ্দিনের মেসার্স ঈশান এন্টারপ্রাইজ।
তবে তদন্তে দেখা যায়, কাগজে সেতুর অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে কোনো নির্মাণ হয়নি। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে এলজিইডির প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে কোটি কোটি টাকা। এলজিইডির সদর, ভাণ্ডারিয়া ও নেছারাবাদ উপজেলার প্রকৌশলীর নামে জাল বিল তৈরি করে জেলা হিসাবরক্ষণ অফিস থেকে অর্থ তোলা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ এবং হিসাবরক্ষণ অফিসের সহযোগিতায় এই প্রতারণা ঘটেছে।
গত ১৫ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এ ঘটনায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। অভিযুক্তদের মধ্যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১৮ জন এখনো পলাতক। পিরোজপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে দুদকের উপপরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম মামলাটি দায়ের করেন। তিনি জানান, দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আয়রন সেতু পুনর্নির্মাণ/পুনর্বাসন প্রকল্প (আইবিআরপি)-এর আওতায় ১২৮টি সেতু নির্মাণের কাজ না করেই আসামিরা যোগসাজশে প্রকল্পের পুরো অর্থ আত্মসাৎ করেন।
উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, পিরোজপুর সদরের কদমতলা ইউনিয়নের পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাঘমারা আবাসন সড়কে যাতায়াতের জন্য একটি ৯৬ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণের জন্য ১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। মিরাজুল ইসলামের প্রতিষ্ঠান ইফতি ইটিসিএল (প্রা.) লিমিটেড ৯ কোটি ২৮ লাখ টাকায় চুক্তি পায়। কিন্তু এলজিইডির প্রকৌশলী হরষিত সরকারের স্বাক্ষর জাল করে সেই টাকা উত্তোলন করলেও বাস্তবে সেতুটি কোথাও পাওয়া যায়নি।
২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে শুধু ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় এমন ১২৫টি স্কিমের আওতায় ২৬৯ কোটি টাকার বেশি তোলা হয়। প্রকল্পের প্যাকেজ নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরেও এর কোনো রেকর্ড মেলেনি। এমনকি কাজের পরিমাপ বইতেও সেতুগুলোর অস্তিত্ব নেই বলে জানিয়েছে দুদক।
এই দুর্নীতি উদ্ঘাটনের প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে এলজিইডির বিশাল একটি প্রকল্পের চিত্র। ২০১৮ সালে দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও খালের ওপর স্থাপিত পুরনো লোহার সেতুগুলো পুনর্নির্মাণের জন্য ‘আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ/পুনর্বাসন প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। এর আওতায় বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় প্রায় ২ হাজার ৪৯টি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটির ব্যয় শুরুতে ধরা হয় ১ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা করা হয়।
এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পুরনো লোহার পুলের স্থলে আরসিসি গার্ডার সেতু নির্মাণ। কিন্তু এখন সেই প্রকল্পই অনিয়মের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১২৯টি সেতুর কাজ শেষ হয়েছে, ৬৪৮টি চলমান রয়েছে, ৮২টি সেতুর কাজ স্থগিত এবং ১৯০টি বাতিল করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু ভাণ্ডারিয়াতেই ১২৫টি সেতু ছিল কাগজে-কলমে, বাস্তবে নয়। এছাড়া পিরোজপুর সদর উপজেলায় দুটি এবং নেছারাবাদে একটি সেতুর অনুমোদন ছিল।
রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে জায়গা করে নেওয়া মহিউদ্দীন মহারাজ স্থানীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিলেন। ২০১৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হন তিনি। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে স্বতন্ত্র হয়েই ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকে হারিয়ে সংসদ সদস্য হন। এরপর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও দলের কঠোর নির্দেশনার মধ্যেও কৌশলে নিজের ভাইদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়ে নেন।
তবে সরকার পতনের পর থেকেই মহারাজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। তাঁদের কারো সঙ্গেই যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এলজিইডির পিরোজপুর অফিসেও এখন প্রকৌশলী বা কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকেন না বলে জানা গেছে। মামলা হওয়ার পর থেকে দপ্তরটিতে গিয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই ঘটনা দেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নজিরবিহীন দুর্নীতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটি উদাহরণ হয়ে উঠেছে যা এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

